হাওরে শঙ্কার ছায়া
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪৮ এএম
দেশের খাদ্যচাহিদার অন্তত ২০-২২ শতাংশ পূরণ হয় হাওর অঞ্চলে উৎপাদিত ধান থেকে। অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে যে ধান বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয় তা দিয়ে দেশের খাদ্যচাহিদার একটা বড় অংশ পূরণ হয়। একসময় বৃহত্তর বরিশাল জেলাকে বাংলাদেশের শস্যভান্ডার বলা হতো। বর্তমানে সে স্থান দখল করেছে হাওর ও বিল অঞ্চল। উল্লিখিত হাওর অঞ্চলগুলো ছাড়াও চলনবিল, রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চল এবং বিক্রমপুরের আড়িয়ল বিলও ধান উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকার জন্য খ্যাত। মূলত এসব অঞ্চলের উৎপাদিত ধান ও অন্যান্য ফসলই বাংলাদেশের খাদ্য ভান্ডারের উৎস। ফলে এসব অঞ্চলে ফসলের সুষ্ঠু চাষাবাদ এবং নিরাপদে ঘরে তোলার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বোরো মৌসুমে দেশের হাওর অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বোরো
চাষ হয়েছে। উৎপাদনের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক। তবে প্রকৃতির খেয়ালি আচরণ উৎপাদক তথা কৃষকের
কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
বৃহত্তর সিলেটসহ দেশের হাওর অঞ্চলে উৎপাদিত ধান কেটে নিরাপদে ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায়
রয়েছেন কৃষকরা। কেননা, ধান পাকার সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়, শিলাবৃষ্টিসহ নানা
ধরনের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার আশঙ্কা বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের লীলাভূমি খ্যাত বাংলাদেশে
এসব দুর্যোগ অবশ্য নতুন নয়। তা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধের ক্ষমতাও মানুষের
আয়ত্তে নেই। তবে, আগাম সতর্কতা অবলম্বন করলে দুর্যোগজনিত ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশেই এড়ানো
সম্ভব।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রীর
উপস্থিতিতে এ নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে কৃষি সচিব, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট
দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে মূলত চলতি মৌসুমে হাওর অঞ্চলের
বোরোর আবাদ, ফসলের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত আলেচনা হয়েছে। সভায়
এ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি উপস্থাপন করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের
তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে হাওর অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫০৫ হেক্টর, আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হাজার
হেক্টর জমিতে। অঙ্কের হিসাবে এটা খুব বেশি না হলেও আশাব্যঞ্জক এজন্য যে, কৃষি, তথা
ফসল উৎপাদনে কৃষকের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে এতে। অবশ্য কৃষি কর্মকর্তারা এ সাফল্যের
পেছনে সময়মতো বীজ, সার, কীটনাশক সরবরাহ, সেচ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের তদারকির ভূমিকাকে
উল্লেখ করেছেন।
বর্তমানে কৃষি একটি সম্মিলিত কার্যক্রমÑ এটা অস্বীকার করা যাবে
না। একসময় কৃষি উৎপাদন নির্ভর করত কৃষকের সামর্থ্যের ওপর। পরবর্তীতে জাতীয় স্বার্থে
অর্থাৎ দেশের খাদ্য সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ হিসেবে
প্রান্তিক পর্যায়ে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করে। বর্তমানে কৃষির প্রায় পুরোটাই যান্ত্রিক,
তথা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। বীজ বোনা থেকে ফসল কাটা পর্যন্ত যন্ত্র-প্রযুক্তির
ব্যবহার কৃষি উৎপাদনকে সহজ করে তুলেছে। উল্লিখিত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, হাওর অঞ্চলের
কৃষকরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তাদের এ আগ্রহের প্রতি গুরুত্ব
দিয়ে যদি কৃষি সরঞ্জাম এবং উপকরণাদি পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ ও সহজলভ্য করা যায়, তাহলে
কৃষক ফসল উৎপাদনে অধিকতর উৎসাহী হয়ে উঠবে। আশার খবর হলো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে
‘কৃষক কার্ড’ বিতরণের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের দিনে তিনি কার্ড
বিতরণ উদ্বোধন করবেন। এটি হবে একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র, যার মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকগণ ভর্তুকি,
কৃষিঋণ, বীজ, সার, কীটনাশক সংক্রান্ত তথ্য পাবে। দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারকে
পর্যায়ক্রমে এ কার্ড দেওয়া হবে। সরকারের এ প্রকল্প সফল হলে বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক
বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে আশা করা যায়। তা ছাড়া সরকার ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা
পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের কৃষিবান্ধব এসব পদক্ষেপ খাদ্য
উৎপাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রাখবে তা অনস্বীকার্য।
এবার বোরো আবাদ যেমন বেশি হয়েছে, ফসলও ভালো হয়েছে। এখন প্রাকৃতিক
দুর্যোগ মোকাবিলা করে কৃষক যাতে উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে পারে, সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ
গ্রহণ জরুরি। হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢলে ফসল তলিয়ে যাওয়া ফি বছরের ঘটনা। ফসল পাকার মৌসুমে
পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টি কৃষকের কষ্টের ফসল বিনষ্ট করে। চোখের সামনে স্বপ্নের ফসল তলিয়ে
যায় পানির নিচে। সে সময় ফসল কাটার শ্রমিক স্বল্পতা কৃষককে বিপাকে ফেলে। অবশ্য বর্তমানে
প্রযুক্তিনির্ভর হারভেস্টর মেশিন ফসল কাটা অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে। তবে হারভেস্টর মেশিন
সহজলভ্য না হওয়ায় অধিকাংশ এলাকার কৃষক এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সরকারের উচিত কৃষি উন্নয়ন
করপোরেশন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিটি অঞ্চলে পর্যাপ্ত সংখ্যক হারভেস্টর
মেশিন সরবরাহ করা।
বিগত সরকারের সময়ে কৃষকদের মূল সমস্যা সমাধানের দিকে নজর না দিয়ে
ফসল কাটার মৌসুমে রাজনৈতিক কমেডি মঞ্চস্থ হতে দেখেছে দেশবাসী। ক্ষমতাসীন দলটির ছাত্রকর্মীরা
মাথায় গামছা পেঁচিয়ে কাস্তে হাতে ‘এক দিনের কিষান’ সেজে সস্তা বাহবা নেওয়ার চেষ্টা
করেছে। দেশবাসী আশা করছে, বর্তমান সরকারের সময়ে সে ধরনের কোনো প্রহসনের মঞ্চায়ন আর
দেখতে হবে না। পরিবর্তে যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবিলায়
সরকার সচেষ্ট হবে।