স্বাস্থ্য
ইসরাত ইমরোজ
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪০ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪২ এএম
ইসরাত ইমরোজ, নবজাতক ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা
হাম একটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে হাঁচি, কাশির মাধ্যমে এটা ছড়ায়। বাচ্চাদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি। ইতোমধ্যে এই প্রাদুর্ভাবের অনেকগুলো কারণ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে; যেমনÑ টিকার ঘাটতি, ক্যাম্পেইন করা হয়নি, মায়েদের টিকা গ্রহণের অনীহা ইত্যাদি। কিন্তু আরেকটা কারণ সকলের অগোচরে রয়ে গেছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
হামের টিকা ৯
মাসের আগে কেন দেওয়া হয় না? উত্তর হচ্ছে ৯ মাস পর্যন্ত মায়ের এন্টিবডি প্রোটেকশন
দেয়। তো এই এন্টিবডি কোত্থেকে আসে? উত্তর, মায়ের বুকের দুধের মাধ্যমে। কিন্তু গত
কয়েক বছরে আমাদের দেশে exclusive breast feeding-এর হার আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
২০১৭ সালে যেটা ছিল ৬৫%, বর্তমানে এটা ৫৫%... তাহলে মায়েদের এন্টিবডি হাম থেকে বাচ্চাদের
সুরক্ষা দিতে পারছে না। এর জন্য শুধু অসচেতনতাই নয়, আরও অনেক ফ্যাক্টর দায়ী। এই ব্যাপারে
দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া খুব জরুরি।
হামের প্রাথমিক
লক্ষণগুলো চিনবেন কীভাবে
হাম হলে শরীরের
ভেতরে ভাইরাস প্রবেশের ১০ থেকে ১২ দিন পর লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। সাধারণ সর্দিকাশির
সাথে এর মিল থাকায় অনেকেই শুরুতে বিভ্রান্ত হন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো :
১. তীব্র জ্বর
: হঠাৎ করেই শিশুর শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়া। তাপমাত্রা আনুমানিক ১০৩/১০৪।
২. সর্দি ও কাশি
: নাক দিয়ে পানি পড়া এবং অনবরত খুসখুসে কাশি থাকা
৩. চোখের সংক্রমণ
: চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং আলোতে তাকাতে শিশুর কষ্ট হওয়া
৪. র্যাশ বা
ফুসকুড়ি : জ্বর শুরুর ৩ থেকে ৪ দিন পর কানের পেছন বা মুখমণ্ডল থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে
সারা শরীরে লালচে র্যাশ ছড়িয়ে পড়া।
লক্ষণ দেখা
দিলে চিকিৎসা
১. দ্রুত নিকটস্থ
চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া। ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা ওষুধ কিনে
খাওয়াবেন না। দ্রুত একজন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন এবং তার নির্দেশিত চিকিৎসা চালিয়ে
যান।
২. তরল ও হাইড্রেশন
: প্রচণ্ড জ্বরে বাচ্চার শরীর খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। তাই বুকের দুধ, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন
বা বাসায় বানানো ফলের রস বারবার খাওয়াতে থাকুন, যাতে কোনোভাবেই ডিহাইড্রেশন না হয়।
৩. চোখের বিশেষ
যত্ন : হামের কারণে বাচ্চার চোখ আলোর প্রতি খুব সেনসিটিভ হয়ে যায় এবং চোখ দিয়ে পানি
পড়ে। ঘরের আলো একটু কমিয়ে রাখুন এবং পরিষ্কার সুতির কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে আলতো
করে চোখ মুছে দিন।
৪. গোসল ও পরিচ্ছন্নতার
মিথ : ‘হাম হলে গোসল করানো যাবে না’Ñ এটি একটি ভয়ংকর মিথ। জ্বর কমাতে এবং র্যাশের
চুলকানি থেকে আরাম দিতে বাচ্চাকে কুসুম গরম পানিতে স্পঞ্জ বাথ করান বা নরম কাপড় দিয়ে
গা মুছিয়ে দিন।
৫. সম্পূর্ণ বিশ্রাম
ও আইসোলেশন : হাম মারাত্মক ছোঁয়াচে একটি রোগ। তাই অন্য বাচ্চাদের থেকে তাকে একদম
আলাদা রাখুন। এই সময়টাতে বাচ্চার শরীরের রিকভারির জন্য প্রচুর এনার্জি দরকার হয়, তাই
তাকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন।
হাম হলে ভিটামিন
‘এ’ ক্যাপসুল দিতে হবে। WHO-এর নিয়ম অনুযায়ী হামের রোগীকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দিলে
রাতকানা রোগ ও শিশু সংক্রামক ব্যাধির কারণে মৃত্যু হার অনেক কমে আসে। হামের ক্ষেত্রে
এন্টিবায়োটিকের ভূমিকা খুব বেশি নেই। তবে এ সময় যেহেতু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে,
তাই অন্যান্য জীবাণু প্রতিরোধ করার জন্য যদি চিকিৎসক মনে করেন তাহলে এন্টিবায়োটিকের
অ্যাডভাইস দিতে পারেন।
হাম সেরে যাওয়ার
পর সোনামণির যত্ন
হামের র্যাশ
মিলিয়ে যাওয়া বা জ্বর কমে যাওয়ার পরও শিশু বেশ কিছুদিন শারীরিকভাবে দুর্বল থাকে। এই
সময় তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরায় গড়ে তোলার জন্য সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের
দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তাকে জোর করে কিছু না খাইয়ে, অল্প অল্প করে বারবার পুষ্টিকর
খাবার দেওয়ার চেষ্টা করুন।
ঝুঁকিপূর্ণ
গ্রুপ : গর্ভবতী
মহিলা, ৫ বছরের নিচের বাচ্চা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা বাচ্চা, কেমোথেরাপি, স্টেরয়েড
জাতীয় ওষুধ সেবন করা মানুষ।
প্রতিরোধ :
বাংলাদেশে
প্রচলিত ইপিআই ভ্যাকসিন সিডিউল অনুযায়ী ৯ মাস এবং ১৫ মাসে হাম ও রুবেলা ভ্যাকসিন দেওয়ার
মাধ্যমে হাম ৯৭-৯৯% প্রতিরোধ করা যায়। বর্তমান সরকার এই হামের আউটব্রেক প্রতিরোধ করার
লক্ষ্যে চলতি ৫ এপ্রিল রবিবার থেকে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী বাচ্চাদের জন্য সরকারিভাবে
হামের টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা অনুযায়ী শুরু করা হয়
এই টিকা দান কর্মসূচি।
এ বিষয়ে কিছু
প্রশ্নের উত্তর নিচে দেওয়া হলো
১. ভ্যাকসিন কোন
শিশুরা পাবে?
Ñআগে টিকা দেওয়া, না দেওয়া বা এক ডোজ দেওয়া ৬
মাস থেকে ৫ বছর বয়সের সব শিশু এই টিকার আওতায় আসবে।
২. বাচ্চার বয়স
৫ মাস.. দিন টিকা পাবে?
Ñছয় মাস পূর্ণ
না হলে পাবে না। অপেক্ষা করুন। শিশুর যত্ন নিন পুষ্টিকর খাবার দিন।
৩. বাচ্চার বয়স
১৫ মাসের ঊর্ধ্বে (১৬-২৪ মাস থেকে ১০ বছর) টিকা পাবে? এই প্রশ্ন করা হচ্ছে কারণ বাবা-মা
কনফিউজড। দেখুন একটি টিকা দিলে ৯৫% এবং ২টি ডোজ দেওয়ার পর ৯৭% ইম্যুনিটি ডেভেলপড হয়!
Ñএ ক্ষেত্রে সবচেয়ে
ভালো টিকা দেওয়া, এটা বুস্টার হিসাবে কাজে আসবে। ক্ষতির তো সম্ভাবনা নেই। তবে immunocompromised
হলে ভিন্ন কথা।
৪. MR-এর এক ডোজের
পর MMR দিয়েছি এখন কী করব? বয়স ১৫ মাসের ঊর্ধ্বে?
Ñ টিকা দিন।
৫. দুই ডোজ ইপিআই
দেওয়া যারা টিকা দেওয়া লাগবে কেন?
-আপনি আসলে বাচ্চাকে
টিকা দেওয়া নিয়ে কনফিউজড। এ ক্ষেত্রে আপনি আপনার বাচ্চার Measles IgG titre করুন
এবং ফলাফল দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
৬. বাচ্চা ৯ মাসের
ইপিআই ডোজ পেয়েছে... দিন আগে মানে ২৮ দিন এখনও (টিকা দেওয়ার দিন পর্যন্ত) হয়নি কী
করব?
Ñইপিআই ফলো করুন।
৭. ইপিআইর প্রথম
ডোজ দেওয়া হয়েছে এবং সেকেন্ড ডোজ দেওয়ার ডেট দিয়েছে (২৮ দিনের মধ্যে) কী করব?
Ñ এ ক্ষেত্রে
আপনি ক্যাম্পেইনের টিকা দিন। ইপিআই দিতে চাইলে ক্যাম্পেইনের টিকা দেওয়ার পর কমপক্ষে
২৮ দিন পর দেবেন। না দিলেও সমস্যা নেই!
৮. ভ্যাকসিন এত
তাড়াতাড়ি কোথা থেকে আসছে কার্যকরী হবে তো?
Ñসরকার GAVI (Gavi
means the Vaccine Alliance, formerly the Global Alliance for Vaccines and
Immunization), is a public-private global health partnership aimed at
increasing access to immunization in poor countries.) থেকে ধার নিচ্ছে। পরে কিনে
ধার শোধ করবে। কাজেই এই টিকার কার্যকারিতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
৯. বাচ্চার একটিভ
ইনফেকশন জ্বর ঠান্ডা কাশি আছে টিকা দিব কি?
Ñ এ মুহূর্তে
না। আগে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
হামের প্রধান
কমপ্লিকেশন বা জটিলতাসমূহ
শ্বাসতন্ত্রের
সমস্যা : নিউমোনিয়া হলো হামের কারণে মৃত্যুর প্রধান কারণ। এ ছাড়া ব্রঙ্কাইটিস, ল্যারিঞ্জাইটিস
বা ক্রুপ (croup) হতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis) : প্রতি ১,০০০ জন হাম
আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ১ জনের মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতে পারে, যা ব্রেন
ড্যামেজ ঘটাতে পারে ।
তীব্র ডায়রিয়া
ও পানিশূন্যতা : এটি শরীরে পানির ভারসাম্য নষ্ট করে মারাত্মক ডিহাইড্রেশন ঘটাতে পারে
।
কানের সংক্রমণ
(Otitis Media) : মাঝখানের কানে সংক্রমণ হয়ে শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে ।
অন্ধত্ব : ভিটামিন
A-এর অভাবে হামের কারণে চোখের কর্নিয়ার ক্ষতি হয়ে অন্ধত্ব হতে পারে ।
গর্ভকালীন জটিলতা
: গর্ভাবস্থায় হাম হলে অকাল জন্ম, গর্ভপাত বা কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি রোগ : বিরল ক্ষেত্রে, হামের ভাইরাস মস্তিষ্কে থেকে গিয়ে কয়েক বছর পর ‘সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যানেন্সফালাইটিস’ (SSPE) নামক মারাত্মক স্নায়বিক রোগ সৃষ্টি করতে পারে ।