× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন সরকার

প্রতিশ্রুত সুশাসন নিশ্চিত করুন

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৫ এএম

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৫৮ পিএম

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, কলাম লেখক ও শিল্প-উদ্যোক্তা

মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল, কলাম লেখক ও শিল্প-উদ্যোক্তা

প্রবাদে আছে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিনÑ এর মূল অর্থ হলো, একটি জাতি বা দেশ যখন দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে, সেই অর্জিত স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখা এবং এর মর্যাদা রক্ষা করা আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং ও কঠিন। আমার দৃষ্টিতে একই কথা প্রযোজ্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করছে। নতুন এই সরকারের কর্মপরিকল্পনায়ও উল্লিখিত প্রবাদের গুরুত্ব রয়েছে বলে আমি মনে করি।

এই লেখায় প্রবাদটি উপস্থাপনে আমার উদ্দেশ্য, কোনো রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়ে জয়ী করা মানে কেবল একটি সরকার নির্বাচন করা নয়Ñ এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার প্রতিফলন। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা তাদের কথা বলবে, অধিকার রক্ষা করবে এবং উন্নয়নের পথে দেশকে এগিয়ে নেবেÑ এটাই গণতন্ত্রের মূল চেতনা। জনগণের এই রায়কে সম্মান করা প্রতিটি সরকারের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচনের পর বিজয়ী দল যদি জনগণের প্রত্যাশা ভুলে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ক্ষমতায় এসে প্রথম কাজ হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ধরে রাখা, তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা।

আর জনপ্রত্যাশা ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। দুর্নীতি দমন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে কাজ করাÑ এসবই একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান কর্তব্য। একই সঙ্গে বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা দেখানো এবং রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করাও জরুরি। বলতে হয়, ভোটের মাধ্যমে অর্জিত বিজয় শুধু ক্ষমতার নয়Ñ এটি একটি অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারলেই প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন বজায় থাকবে এবং গণতন্ত্র হবে শক্তিশালী।

আমি বলতে চাই, সরকারকে জনগণের ভোটের মর্যাদা দিতে হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের ভোট। একটি দেশের মানুষ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, তখন তারা শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং একটি আদর্শ, একটি প্রত্যাশা এবং একটি ভবিষ্যৎ বেছে নেয়। তাই জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্বই নয়Ñ এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকারও। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সময় সেই ভোটের মূল্যায়ন যথাযথভাবে হয় না, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কার্যকাল মাস পেরিয়েছে। এ কথা সত্য যে, কোনো সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এক/দু মাস খুবই অপ্রতুল সময়। সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝে উঠতেই দু/এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। তার ওপর একটি সরকারের বিদায়ের পর আরেকটি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের যে পরিপ্রেক্ষিতÑ এ সরকারের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ভিন্ন। এ সরকার এসেছে বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি ও দুঃশাসন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে।

সরকার তার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফের মতো প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ। ইতোমধ্যে তার কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ সরকার তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তৎপর, যা দেশবাসীর মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে।

ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সকল সিটি করপোরেশন ও সকল জেলা পরিষদে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারদলীয় পক্ষে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন, আবার কেউ দলটির মনোনয়ন বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু বিএনপি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ তাই প্রশাসক নিয়োগ নয়, স্থানীয় সরকারে দ্রুত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়াটাই সরকারের করণীয় হওয়া উচিত।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। যার প্রভাব এসে পড়েছে দেশের বাজারেও, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দেশে তেল সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ তেল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়েকটি পাম্প চালু আছে সেগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং তেল নেওয়ার সময় মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। গত এক মাসেও এই সংকটটি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। সামনের দিনগুলোতে এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে সুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। সুশাসন মানে শুধু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা নয়Ñ এর অর্থ হচ্ছে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। একটি সরকার তখনই সফল বলে বিবেচিত হবে, যখন জনগণ মনে করবে তাদের মতামত ও ভোটের মূল্য রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে যে নজিরবিহীন হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালানো হলো, তা স্বাধীন সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার নামান্তর। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা, সীতাকুণ্ডে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, হবিগঞ্জে চা-বাগানে নারী ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী হত্যা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগে শিক্ষিকা হত্যা, পাবনায় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ইত্যাদি প্রমাণ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বশীল হতে পারেনি।

কার্যত সেই সরকারের দায়িত্বে অবহেলা বা ব্যর্থতার ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকার। তাই এসব ঘটনার তদন্ত ও আইনি প্রেক্ষাপট সামনে আনার বিষয়টি নিয়েও কথা বলছেন কেউ কেউ। আসলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও জরুরি। প্রতিহিংসা, সহিংসতা ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সহনশীলতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।

এটা বাস্তব সত্য যে, দুর্নীতি সুশাসনের সবচেয়ে বড় বাধা। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। যখন মানুষ দেখে যে ঘুষ, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কাজ হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আইন সবার জন্য সমান হতে হবেÑ এটাই সুশাসনের অন্যতম শর্ত। তাই বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে মানুষ ন্যায়বিচার পায় না। ফলে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা জনগণের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং সুশাসনের ভিত্তি মজবুত করে।

প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে। সরকারি সেবাগুলো সহজ, দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত করতে পারলেই জনগণ সরকারের প্রতি আস্থা পাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন সৎ ও দায়িত্বশীল মানসিকতা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত থাকবেই। সেই মতকে দমন না করে বরং তা সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে হবে। সমালোচনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এতে সরকার আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে এবং জনগণের আস্থা বাড়বে।

সামগ্রিকভাবে, সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে ছিল। তার ওপর বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় সরকারকে একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তারপরও এক মাসে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায় শুরুটা মন্দ নয়।

সবশেষে বলতে হয়, জনগণই একটি দেশের প্রকৃত শক্তি। তাদের ভোটের মর্যাদা রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। সরকার যদি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে। আর যদি তা না হয়, তাহলে উন্নয়নের গতি থমকে যাবে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। সময় এসেছে জনগণের ভোটের প্রকৃত মূল্যায়ন করার। সুশাসন প্রতিষ্ঠা বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজন। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সকল নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন এই সরকারকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতায় আসা যত সহজ, ক্ষমতা ধরে রেখে সুশাসন নিশ্চিত করা তার চেয়েও কঠিন।


মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বাদল

কলাম লেখক ও শিল্প-উদ্যোক্তা 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা