জুলাই সনদ
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০১ পিএম
‘জুলাই সনদ’ এমনই এক বাস্তবতা, যা কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির নতুন রূপরেখা নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় দলিলটি ঘিরে চলমান রাজনৈতিক বিরোধ বিশেষ করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টে এনে দাঁড় করিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
গণভোট এবং জুলাই
সনদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়।
বরং মতভেদ, বিতর্ক এবং সমালোচনাÑ এসবই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের অপরিহার্য
উপাদান। কিন্তু এই মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই রাজপথে বিভক্তি, সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতার
কারণ না হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশের
রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, রাজপথের সংঘাত শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী
না করে বরং দুর্বল করে দেয়।
জুলাই সনদের মূল
লক্ষ্য রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করা। দীর্ঘদিন ধরে
বাংলাদেশের সংবিধানিক কাঠামোয় নির্বাহী ক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে
কেন্দ্রীভূত ছিল। নতুন প্রস্তাবনাগুলো সেই একচ্ছত্র ক্ষমতাকে কিছুটা সীমিত করে রাষ্ট্রপতির
ভূমিকা বাড়ানোর কথা বলছে। পাশাপাশি সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল,
বিরোধী দল এবং বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবÑ নিঃসন্দেহে
একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এটি কার্যকর হলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয়
প্রভাব কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
এ ছাড়া সংসদ
সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০
বছরে সীমাবদ্ধ করা, উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মতো প্রস্তাবগুলোÑ
সব মিলিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এসব
বিষয়ে সরকারি দল বিএনপির মৌলিক কোনো আপত্তি নেই, যা একটি ইতিবাচক দিক।
তবে বিরোধের মূল
কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নÑ একই ব্যক্তি কি দলীয় প্রধান,
সংসদ নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন? জুলাই সনদে এই তিনটি পদ আলাদা রাখার
প্রস্তাব করা হলেও বিএনপি এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে। তাদের যুক্তি, বাংলাদেশের বর্তমান
রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় নেতৃত্ব, সংসদীয় নেতৃত্ব এবং সরকারের নেতৃত্ব আলাদা হয়ে
গেলে দলীয় শৃঙ্খলা ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই যুক্তিকে একেবারে
উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি,
যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। বরং নেতৃত্বের বিভক্তি
অনেক সময় দলীয় কোন্দল, ষড়যন্ত্র এবং অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। সুতরাং বাস্তবতার
নিরিখে বিএনপির এই অবস্থানকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা কঠিন। তবে দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের
প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বাড়াতে এই সংস্কৃতির দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া জরুরিÑ এ কথাও
অস্বীকার করা যায় না।
অন্যদিকে সংসদে
দাঁড়িয়ে বিএনপির অন্যতম নীতিনির্ধারক সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যÑ ‘আবেগ দিয়ে দেশ
চলে না’, রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার প্রতিফলন। সত্যিই আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র
পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত আইন, নীতি এবং বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত।
বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত দেশকে আরও ঝুঁকির
মধ্যে ফেলতে পারে।
তবে এ কথাও সমানভাবে
সত্য যে, আবেগই মানুষের রাজনৈতিক চেতনার মূল চালিকাশক্তি। জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম,
গণআন্দোলন কিংবা যেকোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে আবেগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। জুলাই অভ্যুত্থানের মতো ঘটনাও আবেগ ছাড়া সম্ভব হতো না। তাই রাজনীতিতে আবেগ
এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই প্রেক্ষাপটে
জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির অবস্থানও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তারা গণভোট এবং জুলাই
সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে, যা নীতিগতভাবে ইতিবাচক। কিন্তু তাদের
কিছু বক্তব্য ও দাবি বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেই মনে হয়। বর্তমান
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতরÑ এ সময়ে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ
অবস্থান রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
উচ্চকক্ষ গঠনের
প্রশ্নে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা চলমান এই বিরোধকে আরও জটিল করে তুলেছে। জুলাই
সনদে ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব থাকলেও বিএনপি তাদের ইশতেহারে আসন
সংখ্যার ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলেছে। এই পার্থক্য কেবল একটি কারিগরি বিষয় নয়;
বরং এটি ক্ষমতার বণ্টন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে এই
ইস্যুতে সমঝোতা না হলে ভবিষ্যতে সংসদীয় কার্যক্রমেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
গণভোটের কাঠামো
নিয়েও প্রশ্ন উঠেছেÑ চারটি ভিন্ন বিষয় একসঙ্গে রেখে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার
ব্যবস্থা স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার দিক থেকে বিতর্কিত। এটি ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশের
সুযোগকে সীমিত করেছে বলেই অনেকের ধারণা। ফলে শুরু থেকেই এই গণভোট নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি
হয়েছে, যা রাজনৈতিক বিরোধকে আরও তীব্র করেছে। এজন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বহুলাংশে
দায়ী বলে আমি মনে করি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক
বিষয় হলোÑ জুলাই সনদ প্রশ্নে চলমান এই বিরোধ যদি রাজপথে গড়ায়, তাহলে চূড়ান্ত পর্যায়ে
ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও জনগণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত
করে না; বরং তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দুর্বল করে দেয়। আরও বড় আশঙ্কা হলোÑ
এই বিভক্তি অতীতের বিতর্কিত ও পতিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করতে
পারে, যার খেসারত পুরো জাতিকেই দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বিএনপি এবং জামায়াতকেই সবচেয়ে
বেশি মূল্য দিতে হবে।
সুতরাং এখন সবচেয়ে
জরুরি হলো সংলাপ, সমঝোতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ। জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে বিতর্ক
হোক, গণমাধ্যমে আলোচনা হোক, বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে সমালোচনা হোক; কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই
রাজপথের সংঘাতে রূপ না নেয়। কারণ এই সনদ কেবল একটি রাজনৈতিক দল বা জোটের বিষয় নয়;
এটি পুরো জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
তাই বিএনপি, জামায়াত,
এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান থাকবে, তারা যেন নিজেদের দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে
উঠে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। একইভাবে সরকারেরও উচিত বিরোধী মতামতকে গুরুত্ব
দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের পথ খোঁজা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে
একটি ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আবারও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ বয়ে আনতে পারে।
আবার একটি সঠিক সমঝোতা বাংলাদেশকে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তাই বলা যায়, জুলাই সনদ এখন কেবল একটি দলিল নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির
একটি টার্নিং পয়েন্ট।
এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ তারা কি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি স্থিতিশীল, ভারসাম্যপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলে জাতিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন, নাকি বিরোধের পথে হাঁটতে গিয়ে নিজেরাই আত্মঘাতী হবেন। কারণ বিএনপি জামায়াতের এই বিরোধ চূড়ান্ত বিচারে পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ত্বরান্বিত করবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক