× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লাইটার কারখানায় আগুন

অবহেলায় শ্রমিকের মৃত্যু কাম্য নয়

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫১ পিএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জে শনিবার অবৈধ একটি গ্যাস লাইট কারখানায় আগুনে পুড়ে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আরেকটি নির্মম সতর্কবার্তা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকার কেরানীগঞ্জে শনিবার অবৈধ একটি গ্যাস লাইট কারখানায় আগুনে পুড়ে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আরেকটি নির্মম সতর্কবার্তা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শনিবার ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবৈধ একটি গ্যাস লাইট কারখানায় আগুনে পুড়ে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আরেকটি নির্মম সতর্কবার্তা। রাজধানীর পাশেই অবস্থিত কেরানীগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিল্প-কারখানা, গুদাম ও ছোট ছোট উৎপাদন ইউনিট গড়ে উঠেছে। সেই এলাকাতেই বারবার ঘটছে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। উল্লেখ্য, দুই বছর আগেও এই গ্যাস লাইটার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে সময় স্থানীয় প্রশাসন কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিছুদিন পর গোপনে ফের কার্যক্রম চালু করে কারখানার মালিক। এতদিন যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছিল কারখানাটি। ৪ এপ্রিল শনিবার দুপুরে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডে ওই কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। 

স্থানীয়দের ভাষ্য, টিনশেড ও দেয়ালঘেরা কারখানাটির ভেতরে আটটি গুদাম ছিল, যেখানে গ্যাস লাইটারের কাঁচামাল মজুদ রাখা হতো। দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে কারখানাটি পরিচালিত হচ্ছিল। আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে এই কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। দুই বছর আগেও কারখানাটিতে আগুন লাগার পর সতর্ক করা হলেও কারখানাটি সরানো হয়নি। বরং স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই কারখানাটি চালু রাখা হয়েছিল। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়রা বলছেন, মালিকের অতি লোভ ও অবহেলাজনিত কারণেই এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ঢাকা জেলার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকের সঙ্গেও কথা বলেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঘটনাটি তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই ঘটনার মূল কারণ খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা। অধিকাংশ কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বা থাকলেও তা অকার্যকর। শ্রমিকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত নিরাপদ বের হওয়ার পথ। বৈদ্যুতিক লাইনের জটিলতা, দাহ্য পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত মজুদ এবং নিয়মিত পরিদর্শনের অভাবÑ সব মিলিয়ে এই কারখানাগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের শিল্প-কলকারখানায় কেন বারবার আগুন লাগে, প্রাণহানি ঘটে, তারপর কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনার পর সবকিছু আবার আগের মতোই চলতে থাকে? এভাবে একের পর এক অগ্নিকাণ্ড আর প্রতিরোধহীন করুণ মৃত্যু কি শ্রমিকের নিয়তি? কিছুদিন পরপর কারখানায়, রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগবে, অসংখ্য শ্রমিক পুড়ে অঙ্গার হবেন। প্রতিটি দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা হয়তো হতাহতের সংখ্যা টুকে রাখেন, হয়তো সরকার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো কোনো পরিবারের জন্য কিছু সাহায্যও মেলেÑ এভাবে তালিকাটি বড় হয়। কিন্তু শ্রমিক তো শুধু সংখ্যা নয়; একটি জীবন, একটি পরিবার এবং তাদের জন্য, স্নেহ, ভালোবাসা, ভরসা ও নির্ভরতা। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রেরই অংশ। তারা ছোট চাকরি করেন কম বেতনে, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কমÑ তাই বলে তাদের প্রাণ সস্তা নয়, মূল্যহীন নয়, এই সত্যটি তাদের জন্যও প্রযোজ্য। 

আমাদের দেশে শিল্পায়নের প্রসার ঘটছে ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। মালিকদের একটি বড় অংশ এখনও নিরাপত্তা খাতে ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। অথচ একটি অগ্নিকাণ্ড শুধু কয়েকজন শ্রমিকের প্রাণই কেড়ে নেয় না, একটি পরিবারের স্বপ্ন, নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎও ছারখার করে দেয়। এই ছয় শ্রমিকের মৃত্যুও তেমনই ছয়টি পরিবারের জন্য আজীবনের বেদনা হয়ে থাকবে। সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিয়মিত পরিদর্শন, লাইসেন্স প্রদান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের অনেক সময়ই দেখা যায় দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোও সহজেই চালু থাকে। ফলে দুর্ঘটনা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। আমরা মনে করি, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর পদক্ষেপ। সকল কারখানায় বাধ্যতামূলকভাবে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত ও নিরপেক্ষ পরিদর্শন চালু করতে হবে, যাতে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে দুর্ঘটনার সময় তারা অন্তত নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর শাস্তি না হলে এই অবহেলার সংস্কৃতি কখনোই বন্ধ হবে না। শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় এড়ানো চলবে না; প্রয়োজন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। কেরানীগঞ্জের এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের আরেকবার মনে করিয়ে দিলÑ শ্রমিকদের জীবন এখনও যথেষ্ট মূল্য পায় না। উন্নয়নের যে গল্প আমরা বলি, তা তখনই অর্থবহ হবে, যখন সেই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা। অন্যথায় এ ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটবে, আর আমরা কেবল শোক প্রকাশ করেই দায় সারব। আমরা চাই, এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন কারখানা যেন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় না থাকে, সে বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হোক এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা