রাজনীতি
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম
মহিউদ্দিন খান মোহন, সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তা কোথায় গিয়ে শেষ হবে, সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। এ উদ্বেগের কারণ অনেকটা ঘরপোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখার মতো। কেননা, স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের জাতীয় জীবনে অগ্রগতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ একাধিকবার এসেছে, আবার তা হাতছাড়াও হয়ে গেছে। আর এর পেছনে প্রধান অনুঘটক ছিল রাজনৈতিক দলগুলোই। তাদের রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা এবং একগুঁয়েমি জ্বলে ওঠা আশার প্রদীপকে দপ করে নিভিয়ে দিয়েছে।
দীর্ঘ নয় মাসের জনযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতা লাভের পর জনগণ আশা করেছিল একটি গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। কিন্তু তাদের সে আশা শুরুতেই হতাশার চোরাবালিতে হারিয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একচ্ছত্রাধিপত্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়ে পড়ে। নিজেদের ক্ষমতার মসনদকে নিষ্কণ্টক করতে বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অভিপ্রায়ে স্বৈরতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করে। ফলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা বিনষ্ট হয়ে যায়। পক্ষান্তরে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি অংশ বিকল্প পন্থা হিসেবে ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ তৎপরতাকে অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করে। এর ফলে দেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং হানাহানি-খুনোখুনি তার জায়গা দখল করে। ক্ষমতাসীনদের দলীয় সংকীর্ণতাই ছিল এর মূল কারণ। অবশ্য এর বিরূপ ফল তাদেরকেই ভোগ করতে হয়েছে। দিতে হয়েছে চরম মূল্য।
জাতির সামনে দ্বিতীয়বার বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ আসে ১৯৯০ সালে। দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে পতন ঘটে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের। এরপর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় নজিরবিহীন সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার পরিচালনায় আসে বিএনপি। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার চেষ্টা শুরু করে। অবশ্য ক্ষমতাসীন হয়ে বিএনপিও এররশাদবিরোধী গণআন্দোলনের সময়ে প্রণীত তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়নে কোনো রকম আগ্রহ দেখায়নি। ফলে যে অঙ্গীকার নিয়ে দলগুলো স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল, তা অপূর্ণ থেকে যায়। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। তাদের সহযোগী হয়ে মাঠে নামে গণঅন্দোলনে পতিত জাতীয় পার্টিও। এভাবে ক্ষমতাচ্যুতির তিন বছরের মাথায় জাতীয় পার্টি পুনর্বাসনের পথ পেয়ে যায়। আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য হয়ে যায় সোনার হরিণ।
গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার তৃতীয় সুযোগটি এসেছে ২০২৪ সালে। ওই বছরের ৫ আগস্ট তীব্র গণঅন্দোলনের মুখে পনেরো বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে। জনগণের মনে আশার আলো পুনরায় প্রজ্বলিত হয়, এবার হয়তো দলগুলো সংকীর্ণতা পরিহার করে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। কিন্তু গণআন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছাত্র নেতৃত্বের একটি অংশের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড সে আশার আলোকেও নির্বাপিত করে দিতে উদ্যত হয়েছে। বর্তমানে যে বিভেদ দলগুলোর মধ্যে বিরাজমান, তা মূলত সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার হবে, নাকি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তা সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে চলছে ‘টাগ অব ওয়ার’। ক্ষমতাসীন বিএনপি আগে-পড়ে গণভোট সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করলেও এখন তারা ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। সরকারের মন্ত্রীদের কেউ কেউ গণভোটকে সংবিধান পরিপন্থী হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের অনুগামী এনসিপি গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কারে রাজি না হলে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে গত ৪ এপ্রিল রাজধানীর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে অনুষ্ঠিত ১১ দলের সমাবেশে তারা বলেছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও তার আলোকে সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকারি দল বিএনপি যে অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা ‘জাতির সঙ্গে বেইমানি’। সরকারের এসব পদক্ষেপ দেশবাসী মেনে নেবে না বলেও তারা জানিয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, সরকার তার বর্তমান অবস্থান থেকে সরে না এলে আগামীতে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ উত্থাপন না করার সুপারিশ করেছে এ সংক্রান্ত সংসদীয় বিশেষ কমিটি। ফলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কেননা, সংবিধানের ৯৩ ধারা মোতাবেক কোনো অধ্যাদেশ জারির পর তা পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন করতে হবে এবং উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে চলতি অধিবেশনে উত্থাপন করা না হলে অন্তত ১৬টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে; যেগুলোর মধ্যে সংবিধান সংস্কার অন্যতম।
মূলত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এখানেই। কারণ জামায়াত-এনসিপি যেভাবে সংবিধান সংশোধন চেয়েছিল, সংসদীয় কমিটির সুপারিশে তার সম্ভাবনা তিরোহিত হতে বসেছে। আর সেজন্যই এখন তারা রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের হুমকি দিচ্ছে। ফলে এরই পরিপ্রেক্ষিতে জনমনে প্রশ্ন জেগেছে, বাংলাদেশ আবার একটি রাজনৈতিক ঝড়ের কবলে পড়তে যাচ্ছে কি না। কারণ তারা দেশের রাজনৈতিক আকাশে ঝড়ের ঘনঘটা দেখতে পাচ্ছেন। বর্তমান পরিবেশকে তারা তুলনা করছেন কালবৈশাখী ঝড়ের আগে ঈশান কোণে একটু একটু করে কালো মেঘ জমে ওঠার সঙ্গে। জনমনের এ শঙ্কার পেছনে প্রধান কারণ হলো, চব্বিশের গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পক্ষশক্তিগুলোর মধ্যে নানা কারণে দ্বিধা-বিভক্তি সৃষ্টি ও ক্রমশ তার বিস্তার। অবস্থা অনেকটা ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে…।’
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতাদের বক্তব্য-মন্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, তারা জাতীয় ঐক্যের পথ থেকে অনেকটাই সরে গেছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বিএনপিকে চব্বিশের আন্দোলনের চেতনাবিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য যেন উঠেপড়ে লেগেছে। তারা বিএনপিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষাকারী ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত করে চলেছে। যদিও সদ্য ক্ষমতাসীন বিএনপি এখন পর্যন্ত এমন কোনো কাজ করেনি, যাতে দলটিকে ওই অভিযোগে অভিযুক্ত করা যায়। অবশ্য আমাদেরে দেশের রাজনৈতিক ট্রেডিশন অনুযায়ী এটা অভিনব কোনো ব্যাপারও নয়। এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে বিদেশি শক্তির ‘শিখন্ডি’, ‘প্রতিভূ’ ‘বরকন্দাজ, ‘তল্পিবাহক’, ‘দালাল’ ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করে জনগণের সামনে নিজেদের অধিকতর দেশপ্রেমিক হিসেবে জাহির করতে সবসময়ই তৎপর। যদিও এ প্রচেষ্টা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি কখনও। কেননা এসব নেতিবাচক প্রচারণা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে না। অবশ্য আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে জনমনে একটি ধারণা দীর্ঘদিন থেকেই পাকাপোক্ত হয়ে আছে যে, দলটি ভারতের স্বার্থরক্ষার প্রহরী। এটা কেবল মৌখিক অভিযোগ নয়, আওয়ামী লীগ তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দিয়ে তা প্রমাণও করেছে।
সে প্রসঙ্গ এখন থাক। বরং আলোচনা করা যাক, জামায়াত-এনসিপি বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যে অভিয্গো তুলছে, তার যৌক্তিকতা কতটুকু। এ দেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি রাজনৈতিক দল। গত শতাব্দীর সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের ভূমিধস পতনের আগ পর্যন্ত এ দুটি দলই ছিল এ দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক। এক্ষেত্রে বিএনপির গণতান্ত্রিক উদারতা ও পরমতসহিষ্ণুতার বিপরীতে আওয়ামী লীগের আচরণ ছিল ভিন্ন। তারা একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে অগণতান্ত্রিক পন্থায় দমন, এমনকি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রয়াস পেয়েছে। ফলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতনের স্টিম রোলারের তলায় বিএনপিকে পিষ্ট হতে হয়েছে। যেহেতু বিএনপির মধ্যে প্রতিশোধপরায়ণতা নেই, তাই আওয়ামী লীগের বর্তমান বিপর্যয়কর অবস্থায়ও তাদের ওপর বিএনপি হয়তো খড়্গহস্ত হবে না। তবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও দলটির নেতাদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, মামলা হয়েছে, বিএনপি সরকার সে বিষয়ে সংবিধান ও্র আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেÑ এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। সাংবিধানিক বিধিবিধান ও আইনের প্রতি বিএনপির এই বিশ্বস্ততাকে কেউ যদি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা হিসেবে চিত্রিত করার প্রয়াস পায়, তাহলে সেটা শুধু সত্যের অপলাপ নয়, তা হবে চরম বিভ্রান্তিকর প্রচারণা।
শঙ্কার বিষয় হলো, সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সৃষ্ট মতবিরোধ ক্রমেই তিক্ততার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তারা একে অপরের প্রতি সেই পুরনো স্টাইলে বাক্যবাণ নিক্ষেপের চর্চায় লিপ্ত হয়েছে। বিএনপি জামায়াতে ইসলামীকে একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য তুলোধুনো করছে। আর জামায়াত কসরত করছে বিএনপিকে ভারতের স্বার্থরক্ষক ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনকারী হিসেবে চিত্রিত করতে। বলা নিষ্প্রয়োজন, বৈরিতা কখনও গণতন্ত্রের পথকে মসৃণ করে না। বরং তা দেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে দেয়। তাই গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে সে পথ পরিহার করে সমঝোতার পথে অগ্রসর হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ