চলমান তাপপ্রবাহ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩১ পিএম
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, এই ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে দেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে তা মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গরমের মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি যেন রুদ্র রূপ ধারণ করেছে। এপ্রিল মাসের প্রথম তিন দিনে দেশে তাপমাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন অতিষ্ঠ হওয়ার উপক্রম। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো ভয়ংকর। একদিনের ব্যবধানে দেশের তাপমাত্রা বেড়েছে সাড়ে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর গত পরশু চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্র রেকর্ড হয়েছে ৩৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওইদিন দেশের ২৩ জেলায় তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। পহেলা এপ্রিল উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে তাপমাত্র ছিল ৩০ ডিগ্রি। পরদিন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একইভাবে কুমিল্লায় তাপমাত্রা এক দিনে ২০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ ডিগ্রিতে। তাপপ্রবাহের থাবা থেকে রেহাই পায়নি রাজধানী ঢাকাও। গত পরশু ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের ২৩ জেলায় তপপ্রবাহ বিদ্যমান রয়েছে। অচিরেই এর বিস্তার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, এই ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে দেশের কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে তা মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। প্রচণ্ড তাপে খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে পানিপ্রবাহ হ্রাস পেলে কৃষিতে সেচকাজ ব্যাহত হবে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে ধানসহ নানা শস্য উৎপাদনে। একইসঙ্গে ফলের উৎপাদন প্রক্রিয়ায়ও তাপপ্রবাহ অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন অন্যতম ফল আমের গুটি এসেছে। এ সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে না থাকলে আমের গুটি ঝরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার ফলে এ বছর আমের উৎপাদন অনেকাংশে হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে আকস্মিক এই তাপবৃদ্ধি জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত গরমে সর্দি-গর্মি, ঠান্ডা-কাশি, জ্বর, হাম-জলবসন্ত (চিকেন পক্স) সহ নানা রোগব্যাধি বেড়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে রয়েছে শিশু ও বয়স্কদের হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা। ইতোমধ্যে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে বগুড়ায় ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর এসেছে। তাপপ্রবাহ এতটাই প্রচণ্ড রূপ ধারণ করেছে যে, শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে রিকশা-ভ্যান-অটোরিকশা চালকরা রাস্তায় বের হতে ভয় পাচ্ছেন। এরই মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘার মতো যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট। যানবাহন চালকরা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘর থেকে অনেকে বের হতে চাচ্ছেন না। ফলে জনজীবন স্থবির হতে বসেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের হাত নেইÑ এটা ঠিক। তবে সে দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়াটা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টির কারণ মানুষের এখন জানা। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, কী করে এসবের বিরূপ প্রভাব হ্রাস করা যায়, তাও আমাদের জানা। পরিবেশবিদরা বহু আগে থেকেই বলে আসছেন, দেশে অবাধে বৃক্ষ নিধন ও নতুন গাছ না লাগানোর ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও প্রতিবছর ৮ জুন সরকার ঘটা করে জাতীয় বৃক্ষরোপণ দিবস পালন করে থাকে, তবে তা খুব একটা কাজে আসছে এ কথা বলার সুযোগ নেই। কেননা, একদিন ঢাকঢোল পিটিয়ে গাছ লাগিয়ে সারা বছর গাছ কেটে বন সাফ করলে ফলাফল নেতিবাচক হওয়াটাই স্বাভাবিক। অবশ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একটি আশার বাণী শুনিয়েছেন। বলেছেন, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে পঁচিশ কোটি গাছ লাগানো হবে। তার এই ঘোষণা যাদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশে সবুজায়নের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা করা যায়।
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ ও শুষ্কতার ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় সেচকাজ ব্যাহত হচ্ছে। যদিও এখন অধিকাংশ এলাকায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ফসলের আবাদ করা হয়। তবে এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে দেশব্যাপী খাল খননের কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। দেশের হাজামজা খাল খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে তা দিয়ে সেচ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। এই কর্মসূচি যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে প্রয়োজনীয় মনোযোগ আবশ্যক।
যেহেতু প্রকৃতির ওপর মানুষের কোনো হাত নেই, তাই এর খেয়ালখুশি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও মানুষের নেই। তবে এর বৈরিতা থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় মানুষের জানা আছে। দরকার শুধু তার সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহার। তাপপ্রবাহে সৃষ্ট উষ্ণ পরিবেশে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করে মানুষ রোগব্যাধি থেকে রেহাই পেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবার স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রকৃতি আমাদের শত্রু নয়, মিত্র। সে মিত্র যাতে আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ না হয়ে ওঠে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।