× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মূল্যস্ফীতির চাপ

নীতিকথার বদলে বাস্তব নীতিমালা বেশি জরুরি

মশিউর রহমান

প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩১ এএম

অর্থনৈতিক চাপ যে সামাজিক পরিসরে এক ধরনের নীরব সহিংসতা তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা সম্ভব। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক চাপ যে সামাজিক পরিসরে এক ধরনের নীরব সহিংসতা তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা সম্ভব। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সামাজিক ক্ষয় মানে সমাজের ভেতরের আস্থা, ন্যায্যতার অনুভূতি, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং সামষ্টিক বোধ দুর্বল হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে এ ক্ষয়ের কয়েকটি সংকেত এখন স্পষ্ট। এগুলোকে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ আখ্যা দিয়ে শুধু ব্যক্তিকে দোষারোপ করলে বাস্তব সমস্যার মূলে পৌঁছানো যায় না। কারণ এগুলোর বড় অংশই জীবনযাপনের বাস্তব চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। নিত্যপণ্যের দাম মানুষের আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধরনই পালটায় এমন না, সামাজিক আচরণও বদলে যায়। নিজেদের চাহিদা মেটানোর স্বার্থেই মানুষকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও কাটছাঁট করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে মননে। মানুষ সময় কম দেয়, ধৈর্য কমে, রাগ দ্রুত আসে, সম্পর্কের জায়গায় হিসাব ঢুকে পড়ে। এজন্যই গণপরিবহনে কারও শরীরে সামান্য ধাক্কা লাগলে বড় ঝগড়া বেঁধে যায়। বাজারে খুচরা পণ্যের দাম নিয়ে কথাকাটাকাটি। অফিস বা ক্যাম্পাসে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা কাজ করে। এগুলোকে অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন না ভেবে সামাজিক চাপের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখতে হবে। 

অর্থনৈতিক চাপ যে সামাজিক পরিসরে এক ধরনের নীরব সহিংসতা তা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন দেখলেই বোঝা সম্ভব। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। বিবিএসের পর্যবেক্ষণ বলছে, ২০২৫ সালের শেষ দুই মাস থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মূলত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ফলেই মূল্যস্ফীতির এ চাপ বাড়ছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক খাদ্য, শিল্প ও জ্বালানি পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রেও অনেকগুলো প্রতিবন্ধকতা দেখা গেছে। যখন সামগ্রিক অর্থনীতিতে পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং দাম বাড়ানো হয় তখন তার চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর। বিশেষত সামাজিক সুরক্ষার আওতায় নেইÑ এমন গোষ্ঠীর ওপর চাপ বেশি পড়ে। শহর এলাকায় যারা চাকরি বা কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত মজুরির নিমিত্তে জীবনযাপন করেন, তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধি সব সময়ই উদ্বেগের। খাবারের দাম বাড়া মানে পরিবারের ওপর ভারী বোঝা। মাসের শেষ সপ্তাহে সংকোচ, ব্যয় সংকোচন, আত্মসংযমের চর্চা জারি করা। আর অনেক সময় তাতে পরিবারের ভেতর অনেক সদস্যের মধ্যে এমন ভাবনা গড়ে ওঠে, তারা অবহেলিত বা বৈষম্যের শিকার। পারিবারিক টানাপড়েন প্রায়শই মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

সামাজিক পর্যায়ে যে চাপ তৈরি হয় তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী যুবসমাজ। অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী বছরের পর বছর বেকার থাকেন। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিলেও নিয়োগপ্রক্রিয়া এতটাই ধীরগতির যে তাদের মূল্যবান সময়ের অপচয় ঘটে। অনেকে বাধ্য হয়ে এমন কিছু আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় যেগুলোকে সামাজিক পর্যায়ে খুব একটা সম্মান দেওয়া হয় না। এগুলোর সামাজিক পর্যায়ে পেশাগত মর্যাদা না থাকায় সিভিতে অভিজ্ঞতা হিসেবে যুক্ত করা যায় না। তাই অনেকে যখন বেসরকারি খাতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন তখন ‘তোমার অভিজ্ঞতা নেই’Ñ এ কথাটি শুনতেই হয়। আবার অনেকে কিছু খাতে ফ্রেশার বা শিক্ষানবিশ হিসেবে যুক্ত হতে বাধ্য হন। এমন বাস্তবতা দেখে অনেকে বিদেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। 

আমাদের সমাজে ন্যায়বিচারের দূরত্ব এবং আস্থার ভাঙন আমাদের জন্য একটি অশনিসংকেত। সামাজিক আস্থার ভিত্তি হলো ন্যায্যতা। মানুষ যখন অনুভব করে যে নিয়ম মানলে লাভ নেই, বরং নিয়ম ভাঙলে সুবিধা পাওয়া যায়, তখন সমাজের নৈতিক যুক্তি বদলে যেতে শুরু করে। বাংলাদেশে মামলার জট দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সম্প্রতি একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা লাখের ঘর ছাড়িয়ে গেছে। এগুলোর প্রশাসনিক জটিলতা তো আছেই। আবার এটার সামাজিক দিকও আছে। আইনি জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার দরুণ মানুষের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ন্যায়বিচার পেতে গেলে অনেক সময় দিতে হয়। অনেক সময় তদবির না করতে পারলে ন্যায়বিচার মেলে না। 

ডিজিটাল পরিসরে তথ্যদূষণ এবং সম্পর্কের ক্ষয় আমাদের আজকের আলোচনার তৃতীয় দিক। বাংলাদেশ এখন বড় ডিজিটাল সমাজ। টেলিযোগাযোগ খাতের তথ্য উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কোটি পেরিয়েছে। এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে ঝুঁকি। সমস্যা ফোন থাকা নয়; সমস্যা হলো ফোনের ভেতরের সামাজিক অর্থনীতি। সেখানে উত্তেজনা দ্রুত ছড়ায়, গুজব দ্রুত ছড়ায়, আর দায়িত্বশীলতা সবচেয়ে ধীরে ছড়ায়। কাউন্সিল অব ইউরোপের তথ্য-অবিশৃঙ্খলা বিষয়ক কাঠামো আমাদের একটি পরিষ্কার ধারণা দেয়। সেখানে মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন এবং ম্যালইনফরমেশনকে আলাদা করে দেখা হয়। অর্থাৎ ভুল করে ছড়ানো তথ্য, ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো ভুল তথ্য এবং ক্ষতির উদ্দেশ্যে সত্য বা বিকৃত সত্য ছড়ানো। বাংলাদেশি বাস্তবতায় এটি খুব পরিচিত। 

ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্ট ২০২৫-এ বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে নিচে এবং সেখানে সামাজিক সহায়তা ও আস্থাকে সুখের গুরুত্বপূর্ণ চালক হিসেবে দেখা হয়। একই রিপোর্টের আলোচনায় দেখা যায়, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে খাওয়ার মতো সাধারণ সামাজিক অভ্যাসও মানুষের সামাজিক সংযোগ ও মানসিক ভালো থাকার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের শক্তি ছিল সামাজিক সংহতি। কিন্তু শহরমুখী জীবন, কাজের চাপ, নিরাপত্তাহীনতা ও ডিজিটাল আসক্তি মিলিয়ে আমরা ক্রমে এমন এক বাস্তবতায় ঢুকছি, যেখানে ‘নিজ নিজ বাঁচো’ মানসিকতা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে।

এ পর্যায়ে যদি আমরা সামাজিক ক্ষয় থামাতে চাই, তবে নীতিকথার চেয়ে বাস্তব শর্ত তৈরি করা বেশি জরুরি। এ ক্ষেত্রে আমাদের চারটি স্তরে কাজ করতে হবে : রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং ব্যক্তি। শুধু নীতিকথা দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। কাঠামো বদলাতে হবে, অভ্যাস বদলাতে হবে, এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক চাপ কমাতে বাজার ব্যবস্থাপনায় সক্ষম নজরদারি, কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষা, যুবদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থান ও দক্ষতা-মিল এবং ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করা জরুরি। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সমাজে রাগ ও হতাশা বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত সহিংসতা ও অবিশ্বাসকে উস্কে দেয়। দ্বিতীয়ত, ন্যায়বিচারকে দৃশ্যমান ও নাগালের মধ্যে আনতে মামলা ব্যবস্থাপনা, সময়মতো বিচার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, আইনি সহায়তা এবং আদালত ও প্রশাসনে জবাবদিহিতার কাঠামো জোরদার করতে হবে। মামলার জট কমানো মানে কেবল কাগজের সংখ্যা কমানো নয়Ñ এটি সমাজের আস্থা ফেরানোর কাজ।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল পরিসরে তিনটি কাজ জরুরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাস্তব মিডিয়া লিটারেসি, প্লাটফর্ম পর্যায়ে হয়রানি ও প্রতারণা প্রতিরোধে দায়িত্বশীলতা এবং পরিবার ও কমিউনিটিতে স্ক্রিন ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা। তথ্যদূষণকে ব্যক্তির দোষ বলে এড়িয়ে গেলে হবে নাÑ এটি একটি নীতিগত ও সামাজিক সমস্যা। চতুর্থত, একাকিত্ব কমাতে কমিউনিটি জীবন ফিরিয়ে আনতে হবে। পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার, খেলাধুলার মাঠ ও ক্লাব, স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ, ক্যাম্পাসে ছাত্র-সহায়তা সার্কেল, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সংযোগ বাড়ানোর সংস্কৃতি। 

‘বাংলাদেশের মানুষ খারাপ হয়ে যাচ্ছে’Ñ এ বাক্যটি সরল মনে হলেও সত্য নয়। সত্যটি কঠিন। আমরা এমন এক সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে চাপ মানুষকে ছোট করে দেয়, অনিশ্চয়তা মানুষকে কঠিন করে দেয় এবং অবিশ্বাস মানুষকে একা করে দেয়। সামাজিক ক্ষয় থামাতে হলে ‘ভালো মানুষ হও’ বলার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। ভালোভাবে বাঁচার শর্ত তৈরি করতে হবে: বাজারে ন্যায্যতা, আদালতে সময়, অনলাইনে নিরাপত্তা, আর জীবনে সম্পর্ক। এগুলোই রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব, সমাজেরও দায়িত্ব এবং আমাদের সবার দায়িত্ব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা