ইস্টার সানডে
রেভারেন্ড জেম্স রানা বিশ্বাস
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০৯ এএম
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মৃত্যু ভয়ে আমরা শঙ্কিত, কারণ মৃত্যুই পারে মানুষের জীবনকে থামিয়ে দিতে। আজকে আমি এমন একটি মৃত্যু এবং কবরের কথা বলব, যেখান থেকে ভয়-হতাশা-শঙ্কা নয়, কিন্তু প্রভু যিশুখ্রিস্ট উচ্চারণ করেছেন মহা আশার বাণী, মহা নিশ্চয়তার বাণী! সেই মৃত্যু এবং কবরটি হচ্ছে, মার্থা ও মরিয়মের ভাই লাসারের। যেখানে উপস্থিত ছিলেন লাসারের পরিবার, তার আত্মীয় প্রিয়জন, যিহুদি নেতারা, যিশুর শিষ্যরা এবং অনেক দর্শক-শ্রোতারা! লাসারের মৃত্যুর ঘটনার কথা যদি ভাবি, লাসার মারা গিয়েছেন, তাকে কবর দেওয়া হয়েছে এবং তিনি চারদিন কবরে আছেন! সকলেই ভীত এবং শোকার্ত! কিন্তু এখানেই ঘটনার শেষ নয়, লাসারের মৃত্যু ও কবর ঘিরে উচ্চারিত হয়েছে মহা আশার বাণী, মহা নিশ্চয়তার বাণী!
প্রথম আশার বাণী
যিশু শুনিয়া কহিলেন, এই পীড়া মৃত্যুর জন্য হয় নাই; কিন্তু ঈশ্বরের গৌরবের নিমিত্ত, যেন ঈশ্বরের পুত্র ইহা দ্বারা গৌরবান্বিত হন। যোহন ১১:৪।
যদি আমরা কখনও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই বা ঈশ্বর এই ধরনের পরিস্থিতির অনুমতি দেন, তাহলে সব সময় আমাদের মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে ঈশ্বরের কোনো মঙ্গল চিন্তা রয়েছে এবং যেটি হয়েছে তার মধ্য দিয়ে ঈশ্বর গৌরবান্বিত হবেন। ঈশ্বর আমাদের জীবনে যে সংকল্প করেন সেটা মঙ্গলের সংকল্প। এই পরিস্থিতির মধ্যে যেন আমরা ঈশ্বরের বিরুদ্ধাচরণ না করি।
দ্বিতীয় আশার বাণী
তিনি এই কথা কহিলেন; আর ইহার পরে তাঁহাদিগকে বলিলেন, আমাদের বন্ধু লাসার নিদ্রা গিয়াছে, কিন্তু আমি নিদ্রা হইতে তাহাকে জাগাইতে যাইতেছি। যোহন ১১:১১।
বিশ্বাসীরা মরে না! বিশ্বাসীদের মৃত্যু, অনন্ত জীবনে বা স্বর্গে যাওয়ার একটি পদক্ষেপ মাত্র। বিশ্বাসীদের মৃত্যু মানেÑ পুনরুত্থানের ভাগী হওয়া। বিশ্বাসীদেরকে পুনরুত্থানের সন্তান বলা হয়েছে, এর মানে তারা মৃত্যুর সন্তান নয়। আর পুনরুত্থানের সন্তান হওয়া মানে আমরা ঈশ্বরের সন্তান। লূক ২০:৩৫-৩৮ আমরাও পুনরুত্থিত হব! মৃত্যুর হুল ভেঙে দিয়েছেন আত্মিক মৃত্যুর আর কোনো কতৃত্ব নেই আমাদের বিশ্বাসীদের জীবনে। কারণ যিশু মৃত্যুকে জয় করে উঠেছেন!
তৃতীয় আশার বাণী
যিশু তাঁহাকে কহিলেন, তোমার ভাই আবার উঠিবে। যোহন ১১:২৩, পুনঃরয় মার্থার উক্তি: ভবিষ্যৎ! মার্থা তাঁহাকে কহিলেন, আমি জানি, শেষ দিনে পুনরুত্থানে সে উঠিবে যোহন ১১:২৪।
যিশু বর্তমান, যিশু স্বয়ং উপস্থিত! তারপরও- অতীতকে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যৎকে বিশ্বাস করি, কিন্তু বর্তমান যে প্রভুআমাদের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছেন এবং তিনি অদ্ভুত কার্য, অলৌকিক কার্য আমাদের জীবনে করতে পারেন এটিকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। মার্থা এবং মরিয়ম অতীতকে বিশ্বাস করেছিল, ভবিষ্যৎকে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু বর্তমানকে নয়? যীশু স্বয়ং উপস্থিত! কিন্তু বর্তমান আমাদের কাছে ধুব্রতারার মতো সত্য। যীশু তাদের সাক্ষাতে দৃঢ়তার সঙ্গে “পরিত্রাণের বার্তা” ঘোষণা করলেন।
চতুর্থ আশার বাণী
যিশু তাঁহাকে কহিলেন, আমিই পুনরুত্থান ও জীবন; যে আমাতে বিশ্বাস করে, সে মরিলেও জীবিত থাকিবে; যোহন ১১:২৫।
একবার চিন্তা করুন এ বিশ্বে কোটি কোটি মানুষ জন্মগ্রহণ করেছে এবং মারা গিয়েছে। কিন্তু সমস্ত মানব ইতিহাসে একজন মাত্র ব্যক্তি মৃত্যু থেকে জীবিত হয়েছেন। মৃত্যুর শক্তি কতÑ একবার চিন্তা করুন। মৃত্যুর কাছে সকল মানুষ অসহায়। মৃত্যু তাদেরকে কবরে আটকে রেখেছে, সেজন্য মৃত্যুকে ভয় পায়। কিন্তু যিশুখ্রিস্ট সেই মৃত্যুকে পরাজিত করে উত্থিত হয়েছেন। সুতরাং মৃত্যুর ক্ষমতার চেয়ে তার ক্ষমতা বেশি। তিনি আর কখনও মরবেন না, মরতে আসবেনও না! মৃত্যুর কোনো কর্তৃত্ব তার ওপরে আর নেই। যিশু ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি জীবন্ত! তিনি বলেছেন, আমি মরেছিলাম, আর দেখ আমি যুগ পর্যায়ের যুগে যুগে জীবন্ত, আর মৃত্যুর ও পাতালের চাবি আমার হাতে আছে। প্রকাঃ ১:১৮।
পঞ্চম আশার বাণী
যিশু বলিলেন, তোমরা পাথরখানি সরাইয়া ফেল। যোহন ১১:৩৯। মৃত ব্যক্তির ভগিনী মার্থা তাঁহাকে কহিলেন, প্রভু, এখন উহাতে দুর্গন্ধ হইয়াছে, কেননা আজ চার দিন। স্বাভাবিকভাবেই মার্থা-মরিয়ম তারা ক্রন্দনরত এবং দুঃখিত ছিলেন, তার ভাই যে আবার জীবিত হয়ে উঠবেন এটি তাদের চিন্তায় ও বিশ্বাসে ছিল না। কিন্তু বর্তমান এটাই। যিশু দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের বললেন।
ষষ্ঠ আশার বাণী
যিশু তাঁহাকে কহিলেন, আমি কি তোমাকে বলি নাই যে, যদি বিশ্বাস কর, তবে ঈশ্বরের মহিমা দেখিতে পাইবে? যোহন ১১:৪০। তখন তাহারা পাথরখানি সরাইয়া ফেলিল। আজকে আমরা অনেকেই আছি হতাশাগ্রস্ত, পাপের অন্ধকারে ডুবে আছি, অবহেলিত, ব্যথিত, নানা সমস্যায় জর্জরিত, অভাব, অসুস্থতা, বেদনা, দুর্দশা, অনিশ্চয়তা, ভয়, জীবনের নানা সমস্যা চতুর্দিক থেকে আপনাকে ঘিরে ধরেছে হয়তো আপনার জীবনে আর কোনো আশা নেই!
সপ্তম আশার বাণী
ইহা বলিয়া তিনি উচ্চরবে ডাকিয়া বলিলেন, লাসার, বাহিরে আইস। যোহন ১১:৪৩।
তারা ঈশ্বরে মহিমা দেখতে পেলেন। জীবিত লাসার আপন বস্ত্রে বেরিয়ে আসলেন। লাসার বেরিয়ে আসার পর, অনেকে ভয় ও ভক্তিতে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তিনি সুনিশ্চতভাবে লাসারকে ডেকেছিলেন! নতুবা পৃথিবীর সমস্ত কবর খুলে যেত! অনেকেই অভিভূত হয়েছিল। তবুও সবটাই মনে হচ্ছিল অবিশ্বাস্য! কারণ লাসার চার দিন আগে মারা গেছেন, আবার যিশু তাকে চার দিন পরে মৃত্যু থেকে জীবিত করে তুললেন।
অনেক সময় আমরা বিশ্বাসে দুর্বল, তাই আমরা ঈশ্বরের মহিমা দেখতে পাই না, আমরা মার্থা-মরিয়মের মতো, অতীতকে বিশ্বাস করি, ভবিষ্যৎকে বিশ্বাস করি, বর্তমান পুনরুত্থিত যিশুখ্রিস্ট আমাদের মধ্যে উপস্থিত, তিনি যে সমস্ত কিছু থেকে আমাদেরকে মুক্ত করতে পারেন, এটিকে আমরা ভুলে যাই। আমরা বিশ্বাস করি না, ফলে আমরা ঈশ্বরের মহিমা দেখতে পাই না।
আপনি বিশ্বাস করুন মুক্ত হবেন। ঈশ্বরের বাক্য আমাদের এই নিশ্চয়তা দেয়Ñ রোমীয় ১০:৯- ১১ পদেÑ কারণ তুমি যদি ‘মুখে’ যিশুকে প্রভু বলে স্বীকার কর এবং ‘হৃদয়ে’ বিশ্বস কর যে, ঈশ্বর তাকে মৃতদের মধ্য থেকে উত্থাপন করেছেন, তবেই তুমি পরিত্রাণ পাবে। কারণ লোকে অন্তরে বিশ্বাস করে, ধার্মিকতার জন্য এবং মুখে স্বীকার করে, পরিত্রাণের জন্য। কেননা শাস্ত্র বলে, ‘যে কেউ তাঁর ওপরে বিশ্বাস করে, সে লজ্জিত হবে না।’
আজকে যিশু আপনাকে বলছেন, “দেখ আমি দ্বারে দাঁড়াইয়া আছি ও আঘাত করিতেছি কেউ যদি আমার রব শুনে, দ্বার খুলিয়া দেয় তবে আমি তাহার কাছে প্রবেশ করিব এবং তাহার সহিত ভোজন করিব এবং সেও আমার সহিত ভোজন করিবে।”
রেভারেন্ড জেম্স রানা বিশ্বাস
খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ, পুরোহিত ও কলাম লেখক