× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

অটিজম দিবস: দায়মুক্তির উৎসব নাকি অঙ্গীকার

মো. ইমন হোসেন

প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫৩ পিএম

অটিজম দিবস হোক প্রতীকী আয়োজন নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তনের অঙ্গীকার।

অটিজম দিবস হোক প্রতীকী আয়োজন নয়, বরং বাস্তব পরিবর্তনের অঙ্গীকার।

গতকাল ২ এপ্রিল, ছিল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। প্রতিবছরই দিবসটিতে কোনো একটি বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিবছরের মতো আজও সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলো নীল আলোয় আলোকিত হবে, আয়োজিত হবে আলোচনা সভা ও সেমিনার। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই নীল আলোর আভা কি সারা বছর অটিস্টিক ব্যক্তিদের জীবনে পৌঁছে? নাকি আমরা কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিনকেই আমাদের সামাজিক দায়মুক্তির উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছি? 

২০২৬ সালে প্রতিপাদ্য হলোÑ ‘অংশগ্রহণমূলক সমাজ ও কর্মসংস্থান

স্নায়ু-বৈচিত্র্যের নতুন দিগন্ত’, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অটিস্টিক শিশুরা সমাজের বোঝা নয়। অর্থাৎ অটিজম কোনো ব্যাধি নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের এক বিশেষ গঠনগত ভিন্নতা বা ‘স্নায়ু-বিকাশজনিত বৈচিত্র্য’। যেমন অটিস্টিক ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগ সাধারণের চেয়ে ভিন্ন হওয়ার কারণে তারা বিশেষ কিছু কাজে (যেমন : গাণিতিক সমস্যা সমাধান, কোডিং বা শিল্পকলা) অতি-দক্ষ হতে পারে। এমনকি, হেনরি এবং কামিলা মার্করামের ‘ইনটেন্স ওয়ার্ল্ড থিওরি’ অনুযায়ী, অটিস্টিক ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক মূলত চারপাশের জগৎকে সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র ও প্রখরভাবে অনুভব করে। এই তত্ত্ব প্রস্তাব করে যে, তাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলো অতি-সক্রিয় হওয়ার ফলে শব্দ, আলো বা স্পর্শের মতো সাধারণ উদ্দীপনাগুলোও তাদের কাছে অত্যন্ত জোরালো বা সংবেদনশীল মনে হয়। একে কোনো স্নায়বিক ত্রুটি বা দুর্বলতা হিসেবে না দেখে বরং ইন্দ্রিয়ের এক ধরনের ‘অতি-সক্ষমতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে মস্তিষ্ক একই সময়ে প্রচুর তথ্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে। এই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার কারণেই অনেক সময় অটিস্টিক ব্যক্তিরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান কিংবা বাইরের জগতের উদ্দীপনা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গুটিয়ে নেন, যা মূলত তাদের প্রখর অনুভূতি সামলে নেওয়ার একটি আত্মরক্ষামূলক প্রক্রিয়া। তাদের এই দক্ষতাকে কাজে লাগানোই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত অটিস্টিক ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৩ লাখের কাছাকাছি। তবে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজম স্পেকট্রামে থাকতে পারে। এবার আসি, ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়দায়িত্ব ও অঙ্গীকারে, যাতে দিবসটির আয়োজন কেবল দায়মুক্তির উৎসব না হয়, বরং সারা বছর অটিস্টিক ব্যক্তিদের জীবনে পরিবর্তনের আলোর আভা নিয়ে আসে। 

প্রথমত, এবং সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো: বাংলাদেশে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ এবং ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য আইনি ঢাল। ওপরে উল্লেখ্য, আইনটিতে ১৬ ধারায় অটিস্টিক ব্যক্তিদের ২১টি সুনির্দিষ্ট অধিকারের কথা বলা হয়েছে ( যেমন, বিদ্বেষমূলক বা বৈষম্যমূলক বা অমর্যাদাপূর্ণ আচরণ থেকে সুরক্ষা, উপযুক্ত শিক্ষা লাভের পূর্ণ অধিকার ও সুযোগ, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুরক্ষা ও সহায়তা লাভ এবং উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন সুবিধা লাভ)। আইন থাকলেও এর প্রয়োগে এখনও আমাদের সমাজে অনেক ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অটিস্টিক ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার মানসিকতা এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। 

দ্বিতীয়ত, সর্বজনীন শিক্ষা নকশা (UDL): প্রতিটি অটিস্টিক শিশুর শেখার ধরন আলাদা, তাই পাঠদান পদ্ধতিতে আনতে হবে বৈচিত্র্য। কেবল মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং ছবি, অডিও এবং মাল্টিমিডিয়ার সমন্বয়ে একটি ‘স্নায়ু-বান্ধব’ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্তত একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘বিশেষ শিক্ষক’ বা ‘শ্যাডো টিচার’ নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাকে কেবল পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিশুর বিশেষ সক্ষমতা অনুযায়ী সাজানোই হোক ২০২৬ সালের মূল লক্ষ্য। 

তৃতীয়ত, স্নায়ু-বৈচিত্র্য বান্ধব কর্মস্থল তৈরি। ২০২৬ সালের কর্মসংস্থান নীতিতে অটিস্টিক তরুণদের স্নায়ু-বৈচিত্র্যকে কেবল সহমর্মিতা নয়, বরং একটি বিশেষ ব্যবসায়িক সম্পদ হিসেবে দেখার সময় এসেছে। বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান SAP তাদের ‘Autism at Work’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, প্রথাগত ভাইভা পরীক্ষার বদলে হাতে-কলমে দক্ষতা যাচাই বা ‘ওয়ার্ক ট্রায়াল’ পদ্ধতি অটিস্টিক ব্যক্তিদের নিয়োগে অনেক বেশি কার্যকর। কারণ, সামাজিক জড়তা বা আই-কন্টাক্টের অভাব অনেক সময় তাদের প্রকৃত মেধাকে আড়াল করে ফেলে, যা কাজের মাঠে কোনো বাধা নয়। এই বৈশ্বিক মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশেও নিয়োগ নীতিতে সংস্কার আনা জরুরি। পাশাপাশি ডেনমার্ক-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Specialisterne-এর সফল উদাহরণ টেনে বলা যায়, অটিস্টিক ব্যক্তিদের বিশেষ একাগ্রতা ও সূক্ষ্ম মনোযোগ কোডিং, সফটওয়্যার টেস্টিং বা গ্রাফিক ডিজাইনের মতো কাজে সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলতা নিশ্চিত করে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত আইসিটি মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন, যা তাদের ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল ইকোনমিতে স্বাবলম্বী করে তুলবে। 

চর্তুথত, সামাজিক, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অটিস্টিক ব্যক্তিদের সামাজিক সুরক্ষা কেবল ভাতার সংকীর্ণ বৃত্তে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি টেকসই ‘সেফটি নেট’-এর আওতায় আনা জরুরি। অটিস্টিক শিশুদের বিকাশে স্পিচ ও অকুপেশনাল থেরাপি অপরিহার্য হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমূল্য অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সংকট নিরসনে সরকারি বা পিপিপি মডেলে বিশেষায়িত স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প চালু করা এখন সময়ের দাবি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যেমন ‘নিরাময়’ নামক বীমা প্রকল্পের মাধ্যমে অটিজমসহ এনডিডি আক্রান্তদের থেরাপি ও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হয়, বাংলাদেশেও এমন মডেল অনুসরণ করে থেরাপি খরচ বীমার আওতায় আনা সম্ভব। এটি পরিবারগুলোকে বড় ধরনের আর্থিক স্বস্তি দেবে এবং শিশুদের নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।

পাশাপাশি স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ডিজিটাল এক্সাসিবিলিটি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অনেক অটিস্টিক ব্যক্তি অতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙ, দ্রুত নড়াচড়া করা ব্যানার বা জটিল মেন্যু অপশনে বিভ্রান্ত (Sensory Overload) বোধ করেন। তাই সরকারি সকল ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপে ‘কগনিটিভ এক্সাসিবিলিটি’ বা সহজবোধ্য সংকেত ব্যবহার করতে হবে। যেমনÑ যুক্তরাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে (GOV.UK) অটিজমবান্ধব নকশা অনুসরণ করা হয়, যেখানে কোনো চটকদার বিজ্ঞাপন থাকে না এবং ভাষা থাকে অত্যন্ত সহজ ও সরাসরি। বাংলাদেশেও যদি নাগরিকসেবা প্রাপ্তির প্লাটফর্মগুলো এমন ‘ক্লিন ডিজাইন’ এবং ‘ভয়েস কমান্ড’ ফিচারের মাধ্যমে সাজানো যায়, তবে অটিস্টিক ব্যক্তিরা কারও সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে পাসপোর্ট আবেদন বা ইউটিলিটি বিল পরিশোধের মতো কাজগুলো করতে পারবে। 

সর্বোপরি, ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য সামনে রেখে, আমাদের অঙ্গীকার হোক, এমন এক বাংলাদেশ গড়া, যেখানে কোনো অটিস্টিক শিশুকে তার সীমাবদ্ধতার জন্য ঘরে বন্দি থাকতে হবে না, বরং সে তার স্নায়ু-বৈচিত্র্যের শক্তি দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।


মো. ইমন হোসেন

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা