ইমেইল থেকে
আল শাহারিয়া
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম
ঝড়ের আগেই উপকূল রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়মে আমাদের এই বদ্বীপ অঞ্চলে আবারও ফিরে আসছে ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম। চৈত্র মাস শেষ হয়ে আসছে এবং কালবৈশাখীর সময় শুরু হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এখন বাতাসের গতিপথ প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এপ্রিল ও মে মাস বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষের জন্য সবসময় এক চরম আতঙ্কের সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের কারণে বঙ্গোপসাগরে এখন ঘন ঘন লঘুচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে এই লঘুচাপগুলো খুব দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার শক্তি সঞ্চয় করে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বিভিন্ন সময়ে প্রলয়ঙ্করী ঝড়গুলো বার বার আমাদের উপকূলকে তছনছ করে দিয়েছে। তাই আসন্ন মৌসুমের দিকে তাকালে একটি বড় প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে চলে আসে। আমাদের উপকূলীয় অঞ্চল কি এবারের দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সত্যি প্রস্তুত?
সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রেমালের স্মৃতি এখনও উপকূলের মানুষের মনে দগদগে ক্ষতের মতো রয়ে গেছে। রেমালের আঘাতে শুধু যে ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছিল তা নয়। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জগতেও এর গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল। ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের একটি সাধারণ পরিবারের কথা ধরা যাক। পরিবারের প্রধান রহিম শেখ এবং তার স্ত্রীর সারা জীবনের সঞ্চয় ছিল একটি মাটির ঘর এবং ছোট একটি মাছের ঘের। রেমালের রাতে যখন নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইতে শুরু করল তখন তাদের চোখে কোনো ঘুম ছিল না। দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে যখন প্রবল বেগে নোনা পানি লোকালয়ে প্রবেশ করল তখন মুহূর্তের মধ্যে তাদের মাটির ঘরটি ধসে পড়ে। অন্ধকার রাতে প্রাণ বাঁচাতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ছুটে যান পাশের একটি উঁচু রাস্তায়। পরের দিন সকালে তারা আবিষ্কার করেন তাদের বেঁচে থাকার আর কোনো সম্বল অবশিষ্ট নেই। খোলা আকাশের নিচে পলিথিন টানিয়ে তাদের শুরু হয় এক নতুন এবং অনিশ্চিত সংগ্রাম। কিন্তু, নিয়মিত জোয়ার-ভাটার খেলা সেটাও স্থায়ী হতে দেয়নি। একসময় তারা অন্যত্র বসবাসের জন্য মানুষের দ্বারস্থ হন। এটি শুধু রহিম শেখের পরিবারের গল্প নয়। এটি উপকূলের হাজারো পরিবারের করুণ বাস্তবতার চিত্র।
উপকূলীয় এলাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমাদের নড়বড়ে বেড়িবাঁধগুলো। যুগ যুগ ধরে এই বাঁধগুলোই সমুদ্র ও নদীর সাথে মানুষের টিকে থাকার প্রধান ঢাল হিসেবে কাজ করছে। কিন্তু পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এই বাঁধগুলো এখন আর মোটেই নিরাপদ নয়। সামান্য জলোচ্ছ্বাস হলেই বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ফাটল দেখা দেয় এবং পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। একবার লবণাক্ত পানি জমিতে প্রবেশ করলে সেই জমিতে চাষবাস খুব একটা হয় না। এর ফলে স্থানীয় কৃষিজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেন। অনেকেই আবার কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই অভিবাসন এখন একটি বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ছাড়া উপকূলের মানুষকে রক্ষা করার আর কোনো বিকল্প পথ নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মূল কথা হলো দুর্যোগ আঘাত হানার পর ত্রাণের জন্য অপেক্ষা না করা। পূর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথেই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই এর মূল লক্ষ্য। যখন আমরা জানি যে, একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে যাচ্ছে তখন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সেখানকার দুর্বল ঘরবাড়িগুলোকে মজবুত করার জন্য স্থানীয়দের সহায়তা করতে হবে। কৃষকদের মাঠের ফসল আগেভাগে ঘরে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। মানুষের হাতে জরুরি নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে তারা দুর্যোগের ঠিক আগে প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার ও ওষুধ কিনে রাখতে পারে। এই আগাম প্রস্তুতি দুর্যোগের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারে। আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তর এখন অনেক নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। কিন্তু সেই পূর্বাভাসকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় এবং সঠিক সময়ে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় যুবসমাজ এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে উপকূলের মানুষের আসল কষ্ট পুরোপুরি অনুভব করা সম্ভব নয়। স্থানীয় তরুণরা তাদের এলাকার ভৌগোলিক গঠন এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব খুব ভালোভাবে বোঝেন। দুর্যোগের সময় সরকারি সাহায্য পৌঁছানোর অনেক আগে এই তরুণরাই প্রথম সাড়া প্রদানকারী হিসেবে কাজ করেন। তাই এই ধরনের স্থানীয় সংগঠনগুলোকে আর্থিকভাবে এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন যুব সংগঠন উপকূলের ইকোসিস্টেম রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বাঁধের ধারে ম্যানগ্রোভ বা কেওড়া গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগগুলো মাটির ক্ষয় রোধ করতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করে। প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের দিকে আমাদের আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
আমাদের উপকূলীয় অর্থনীতির আরেকটি বড় অংশ হলো মৎস্য খাত। কিন্তু সমুদ্রে ঘন ঘন সতর্ক সংকেতের কারণে জেলেদের জীবন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। সতর্ক সংকেত পড়লে জেলেদের বাধ্য হয়ে খালি হাতে তীরে ফিরে আসতে হয়। তাদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু ঋণের কিস্তি ঠিকই চালু থাকে। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তারা আরও বেশি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। দুর্যোগকালীন সময়ে এই জেলে পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধুমাত্র ত্রাণ বিতরণ করে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাদের জন্য জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এমন ধানের জাত উদ্ভাবন এবং তা মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা এখন সময়ের দাবি।
উপকূলীয় মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের গল্প। তারা প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার নির্মম শিকার। অথচ এই বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে তাদের নিজস্ব কোনো দায় নেই। তারা আমাদের কাছে কোনো দয়া বা করুণা চায় না। তারা শুধু চায় তাদের ন্যায্য অধিকার এবং বেঁচে থাকার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে শুরু করে আমাদের নীতিনির্ধারক সবারই উচিত উপকূলের এই বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুম আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। প্রকৃতি তার আপন নিয়মে চলবে। কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি যেন কোনোভাবেই দুর্বল না হয়। একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল আমরা আমাদের উপকূলকে সুরক্ষিত রাখতে পারি। আসুন, আমরা শুধু দুর্যোগের পরেই নয় বরং দুর্যোগ আসার আগেই উপকূলের মানুষের পাশে দাঁড়াই।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর