ইমেইল থেকে
সংগ্রাম দত্ত
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০১ পিএম
লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড পার্ক এলাকায় নির্মাণাধীন কালি হোটেল (Kali Hotel & Rooftop) প্রকল্পটি কালী প্রদীপ দত্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ।
বাংলাদেশের সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার দত্তরাইল থেকে শুরু হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বিস্তৃত বহুমুখী ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা ড. কালী প্রদীপ দত্ত চৌধুরীর পথচলা আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা জগতের এক উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। চিকিৎসা পেশা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের নেতৃত্বÑ এই যাত্রা তাকে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হলেও বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত এক ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
ড. চৌধুরীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় সিলেটের এমসি কলেজে। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে সেখানে পৌঁছে তিনি স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিজের পেশাগত যাত্রা শুরু করেন, যা ধীরে ধীরে উদ্যোক্তা নেতৃত্বে রূপ নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে তিনি একটি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীতে সেটিকে অধিগ্রহণের মাধ্যমে তার ব্যবসায়িক ভিত্তি শক্তিশালী করেন। এই প্রাথমিক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কেপিসি গ্রুপ (KPC Group), যা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বহুমুখী করপোরেট প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। কেপিসি গ্রুপের প্রধান কার্যক্রম কেন্দ্র দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস ও আশপাশের অঞ্চল। এখানে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক হাসপাতাল পরিচালনা করছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক শয্যা এবং চিকিৎসক নেটওয়ার্ক যুক্ত রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি রিয়েল এস্টেট, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আতিথেয়তা খাতে গ্রুপটির বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য।
লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউড পার্ক এলাকায় নির্মাণাধীন কালি হোটেল (Kali Hotel & Rooftop) প্রকল্পটি তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক হসপিটালিটি ব্র্যান্ড ম্যারিয়টের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পে আবাসন, কনফারেন্স সুবিধা, রেস্তোরাঁ এবং সুস্থতা কেন্দ্রসহ বহুমুখী অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি ক্যালিফোর্নিয়ায় তার ব্যবসায়িক অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা অঞ্চলে হাজার হাজার একরজুড়ে মাস্টার-প্ল্যানড কমিউনিটি উন্নয়নের কাজ চলছে, যা আবাসিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোকে একত্রে সংযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে গড়ে উঠছে। হেমেট শহরে ‘চৌধুরী সার্কেল’ নামে একটি স্থানও তার উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত, যা স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রভাব ও উপস্থিতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এই বিস্তৃত কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়ী মহলে ‘বিজনেস টাইকুন’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিশেষ করে, ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বাস্থ্যসেবা ও রিয়েল এস্টেট খাতে তার বিনিয়োগ ও নেতৃত্ব তাকে একটি প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার কার্যক্রম শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে, কেপিসি গ্রুপের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ একাধিক অঞ্চলে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই বৈশ্বিক বিস্তৃতি তার উদ্যোক্তা পরিচয়কে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
প্রবাসী বাংলা গণমাধ্যম প্রথম আলো নিউইয়র্কে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে লস অ্যাঞ্জেলেসে তার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা উঠে আসে, যেখানে প্রবাসী পরিচয় ও মাতৃভূমির প্রতি তার আবেগ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক শেকড় তার পেশাগত জীবনের বাইরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ড. চৌধুরীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশ সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক মিডিয়া এনটিভির সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে যে তিনি ৩৯ বার আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে সফর করেছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ঢাকার পূর্বাঞ্চলীয় উন্নয়ন এলাকা (পূর্বাচল) একটি বহুতল টাওয়ার এবং সিলেটের গোলাপগঞ্জে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও আলোচিত হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে এসব বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু কাঠামোগত ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতিকে ধীর করেছে। এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ পরিবেশে পার্থক্যের একটি সাধারণ উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হয়, যেখানে বিভিন্ন দেশের নীতি ও প্রক্রিয়া ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে।
তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাসও তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে। সিলেট জেলার ঢাকা দক্ষিণ দত্তরাইল জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি ঐতিহ্য, সমাজসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ধারাকে গুরুত্ব দেন। এই ঐতিহ্য তার ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনায় ধারাবাহিকতা ও স্থায়িত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করেছে।
চিকিৎসক হিসেবে পেশাগত সূচনা এবং পরবর্তীতে উদ্যোক্তা হিসেবে উত্থানÑ এই দুই ক্ষেত্রকে একত্র করে তিনি একটি সমন্বিত নেতৃত্বের মডেল গড়ে তুলেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের শৃঙ্খলা, বিশ্লেষণ এবং নির্ভুলতা তার ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছে বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়।
আজ কেপিসি গ্রুপ একটি একক খাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, রিয়েল এস্টেট, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আতিথেয়তাÑ এই বিভিন্ন খাতকে একত্রে সংযুক্ত করে একটি সমন্বিত করপোরেট কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। এই বহুমাত্রিক কাঠামো তাকে বৈশ্বিক উদ্যোক্তা মানচিত্রে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে।
সিলেট থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়ার উন্নয়ন প্রকল্প পর্যন্ত বিস্তৃত এই যাত্রা দেখায় কীভাবে অভিবাসন, শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা এবং কৌশলগত বিনিয়োগ একত্রিত হয়ে একটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে রূপ নিতে পারে। ড. কালী প্রদীপ চৌধুরীর গল্প তাই কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি শেকড় থেকে উঠে আসা উদ্যোক্তা শক্তিরও প্রতিফলন।
সংগ্রাম দত্ত
কলাম লেখক, সিলেট