পাচারকৃত অর্থ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৭ এএম
প্রধানমন্ত্রী যখন পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের কথা জানান, তখন দেশবাসী সংগত কারণেই আশান্বিত হয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার হওয়া ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত পরশু জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান। একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণের অর্থ ফেরত আসবে, সরকার সে পদক্ষেপই গ্রহণ করবে। এ প্রসঙ্গে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশগুলো হচ্ছেÑ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকং-চীন। এগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এ বিষয়ে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি মিলেছে। অপর দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। প্রধানমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তা ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা রুজু করা হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে।
আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় হুমকি দেশ থেকে অর্থ পাচার। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ অবৈধ পন্থায় অর্থ আয় করে তা বিদেশে পাচার করে দেয়। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পুঞ্জীভূত কালোটাকা বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে পাচার করে থাকে। এ ক্ষেত্রে তারা আমদানি-রপ্তানির এলসির আশ্রয় নিয়ে থাকে। আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যমূল্য কম দেখিয়ে অন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করে থাকে। পাচারকৃত এ অর্থের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে এলেও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা রয়ে যায় দেশের বাইরে। তবে এর বড় অংশ কখনোই দেশে ফেরত আসে না। এই অর্থে গড়ে ওঠে কানাডার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম, দুবাইয়ের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও মল। এই পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে দুর্নীতিবাজ আমলা-ব্যবসায়ী, কতিপয় রাজনৈতিক নেতা এবং ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত। এমনকি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টিও এখন প্রমাণিত। বাংলাদেশে ব্যাংকের রিজার্ভ ডাকাতিই তার বড় প্রমাণ।
দেশ থেকে অর্থ পাচারের ভরা মৌসুম ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পনেরো বছরের শাসনামল। সে সময় দেশে যেমন দুর্নীতির ভাইরাস মহামারির রূপ ধারণ করেছিল, তেমনি সে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে দেদার। এ নিয়ে সে সময়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে। তৎকালীন সরকারের কর্তা-কর্ত্রীরা হম্বিতম্বিও করেছেন। কিন্তু সবই ছিল লোক দেখানো। ফাঁকা বুলি কপচালেও দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ বা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। এর মূল কারণ ছিল ভূত তাড়ানোর শর্ষের মধ্যেই ছিল ভূতের বাসা। স্বয়ং সরকারপ্রধান ও তার স্বজন-পরিজনরাই জড়িত ছিলেন দেশবিধ্বংসী এই অপকর্মে। ফলে অন্যরা পেয়ে গিয়েছিলেন অবাধ সুযোগ। যে কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত ফোকলা হতে বেশি সময় লাগেনি। আজ দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট, তার মূলে রয়েছে বিগত সরকারটির আমলের লুটতরাজ ও অর্থ পাচার।
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যখন পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের কথা জানান, তখন দেশবাসী সংগত কারণেই আশান্বিত হয়। কেননা, এই সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত এবং দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেÑ এ কথা তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। তারা এটাও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যা বলেন, তা আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়ন করার দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে, এ ক্ষেত্রে সরকারের সবগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সক্রিয়তা অপরিহার্য।
এটা বিশ্বাস করার সুযোগ নেই যে, দুর্নীতিগ্রস্ত লীগ সরকার বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ী ও অর্থ পাচারকারীও কর্পূরের মতো উবে গেছে। তারা এখনও এ রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্থানে সুযোগের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে আছে। দুর্নীতিবাজদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এরা সময় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে এবং নিজেদের ধান্দা ফিকিরের পথ বের করে নিতে পারে। তাই প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, যাতে পতিত সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারী চক্র পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। এ ক্ষেত্রে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’ অর্থাৎ ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’Ñ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ এ সূত্রকে সক্রিয় বিবেচনায় রাখা জরুরি।