নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৩ এএম
নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমরা ছোটবেলায় ‘বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ’ বিষয়ে একটা রচনা শিখেছিলাম। শিখেছিলাম বললে ভুল বলা হবে। মূলত না বুঝে মুখস্থ করেছিলাম। যখন মুখস্থ করেছি, তখন একেবারেই বুঝিনি যে আসলে বিজ্ঞানের সঙ্গে আশীর্বাদ বা অভিশাপের কী সম্পর্ক থাকতে পারে। সেই স্কুলের ছাত্রজীবন থেকে এখন পর্যন্ত জীবনের বড় একটি অধ্যায় পার করে দিলেও, বিজ্ঞানের অভিশাপটা সেভাবে বুঝতে পারিনি। বিজ্ঞানের আশীর্বাদ স্পষ্টতই বোঝা গেছে এবং ভোগ করা সম্ভব হয়েছে। আসলে বিজ্ঞান যেভাবে এগিয়েছে, তাতে এর সুবিধা বা আশীর্বাদ পেয়েছে কমবেশি অধিকাংশ মানুষ। কিন্তু আশীর্বাদের পাশাপাশি বিজ্ঞানের যে ভয়ংকর এক অভিশাপের দিক আছে, সেটা সবাই সেভাবে বুঝতে পারে না। একমাত্র ভুক্তভোগীরাই বিজ্ঞানের অভিশাপের দিকটি বুঝতে পারে। যেমন, জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকির অধিবাসীরা বুঝেছিল যে বিজ্ঞান কি ভয়ংকর অভিশাপ। এখন যেমন ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ বুঝতে পারছে বিজ্ঞান কী মাত্রার অভিশাপ হতে পারে। শুরু থেকেই বিজ্ঞান সব মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকলেও, ক্ষেত্র এবং অঞ্চলভেদে কিছু মানুষের জম্য ভয়ংকর এক অভিশাপ হয়ে এসেছে, এখনও আসছে এবং ভবিষ্যতেও আসবে।
বিজ্ঞানের যে আবিষ্কার মানুষের জীবনে একদিকে যেমন সেরা আশীর্বাদ, অন্যদিকে তেমনি মারাত্মক অভিশাপ, তা হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের জীবনকে যে কত সহজ, গতিময় এবং আরামদায়ক করে দিয়েছে, তা কল্পনারও বাইরে। আবার তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমনÑ ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্সের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলো মানুষের উপকার যতটুকু করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি করেছে। ফেসবুক তো কিছু মানুষের পুরান প্রেমিক খুঁজে পাওয়া এবং যা খুশি তাই লাগামহীনভাবে পোস্ট করা ছাড়া, আর কোনো ভালো কাজে এসেছে বলে মনে হয় না। অথচ এই ফেসবুক এবং ইউটিউব হতে পারত ভালো একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম, যদি মেটা এবং গুগল এক ধরনের এডিটরিয়াল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সত্য, বস্তুনিষ্ঠ এবং কারও জন্য ক্ষতিকর নয় এমন বিষয় পোস্ট করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোম্পানিগুলো অতিমাত্রায় লাভ করার উদ্দেশ্যে সবকিছু ফ্রি এবং লাগামহীন করে দিয়ে এই মাধ্যমকে মানবজাতির চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের আদালত ফেসবুকের প্যারেন্ট কোম্পানি মেটা এবং ইউটিউবের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় ছেলেমেয়েদের সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে আসক্ত করার ব্যাপারে অবহেলার প্রমাণ পেয়েছে। মেটা এবং ইউটিউবের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে ভুক্তভোগীকে বড় অঙ্কের জরিমানা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে। বিশ বছর বয়সী এক ভুক্তভোগী মেটা এবং ইউটিউবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে যে, সেই ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকা অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে আসক্ত হয়ে যায় এবং পরিণতিতে তার মারাত্মক মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক এবং ইউটিউব এরকম অতিমাত্রার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বিশেষ অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অতি ব্যবহারকে উৎসাহিত করেছে। ফলে সেই ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, উল্টো ফেসবুক এবং ইউটিউবের অ্যালগরিদমের ফাঁদে পড়ে অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত হয়ে যায় এবং পরিণতিতে তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। বিচারিক আদালত ভুক্তভোগীর অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায় এবং এ ব্যাপারে মেটা ও ইউটিউবের অবহেলাও প্রমাণিত হয়। ফলে আদালত ভুক্তভোগীকে তিন মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয় মেটা এবং ইউটিউবÑ উভয় কোম্পানিকে। এর পাশাপাশি আরও তিন মিলিয়ন ডলার পিউনিটিভ ড্যামেজ হিসেবে প্রদানের জন্য এই দুই সামাজিক যোগাযোগ কোম্পানিকে নির্দেশ প্রদান করেছে।
মেটা এবং ইউটিউবের প্যারেন্ট কোম্পানি, গুগল অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে। উচ্চ আদালত যদি বিচারিক আদালতের রায়কে বহাল রাখে, তখন মেটা এবং গুগলকে এই জরিমানার টাকা গুনতে হবে। বিষয়টি যে এখানেই শেষ হবে, তেমন ভাবার কারণ নেই। কেননা উচ্চ আদালতের এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে গৃহীত হবে, যা সামনে রেখে এরকম হাজার হাজার মামলা যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দায়ের হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ কোম্পানিগুলোকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার জরিমানা গুনতে হবে। কেননা আমেরিকায় অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আসক্ত হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা একেবারে কম নয়। অধিকাংশ পরিবারে এটি একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।
ফেসবুক এবং ইউটিউবের অ্যালগরিদম যে মানুষকে অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে প্ররোচিত করে, তা বোঝা বা প্রমাণের জন্য আদালত পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যারা ব্যবহার করেন, তারা একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এলগরিদমের কারণেই একটা ভিডিও বা রিল দেখামাত্র ক্রমাগত সেই ধরনের ভিডিও বা রিল একের পর এক আসতে থাকে, যা দেখতে মানুষ অতিমাত্রায় প্রলুব্ধ হয়। এমনকি একটি ভিডিও বা রিল শেষ না করেই অন্য ভিডিও বা রিলে চলে যায় এই ভেবে যে সেখানে না জানি এমন কী আছে। একইভাবে ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখামাত্র, সেখানে লাইক দেওয়া, শেয়ার করা বা পাল্টা পোস্ট দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এই ধরনের প্রবণতাই হচ্ছে মারাত্মক আসক্তি, যা মাদকাসক্তির চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক। ক্ষতিকর ড্রাগ বা মাদক যেমন যত সেবন করা হয়, তত বেশি সেবন করতে উত্তেজিত হয়। ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও সে রকমই। যে যত বেশি এই মাধ্যম ব্যবহার করবে, সে তত বেশি এই মাধ্যম ব্যবহারে প্রলুব্ধ হবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলস আদালত এর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এই রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকলে আমেরিকায় হয়তো অপ্রাপ্তবয়স্কদেরকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আসক্তি থেকে রক্ষার একটা গ্রহণযোগ্য পন্থা বের হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমেরিকার আইনে আমেরিকার অপ্রাপ্তবয়স্করা এই ভয়াবহ আসক্তির হাত থেকে রক্ষা পেলেও, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের কী হবে। আমাদের দেশেও তো এই সমস্যা এক মারণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। আমাদের দেশে প্রত্যেকটা স্কুল-কলেজগামী ছেলেমেয়ে ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ পড়ে থাকে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ কারণে কয়েকটি প্রজন্ম প্রকৃত শিক্ষাদীক্ষা থেকে পিছিয়ে পড়ছে। ঘটছে অনেক অঘটন এবং পারিবারিক কলহ। আমাদের দেশে শুধু অপ্রাপ্তবয়স্ক কেন, প্রাপ্তবয়স্করাও এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আসক্ত। বলা চলে, আমাদের দেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা এবং ধনী, গরিব, মধ্যবিত্ত, নির্বিশেষে সকলেই এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্ত।
আমাদের দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রাপ্তবয়স্কদেরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সীমিত বা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এবং ঘুম নষ্ট করে গভীর রাত পর্যন্ত ফেসবুকে বা ইউটিউবে পড়ে থাকার কোনো প্রয়োজন থাকতে পারে না। প্রথম ক্ষেত্রে কাজটা বেশ সহজ। এখন সবারই জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, যেখানে জন্মতারিখ থাকে। এই জন্মতারিখ হিসাব করে যাদের বয়স আঠারো বছরের নিচে, তাদের ফোনে কোনোরকম ইন্টারনেট সংযোগ না দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যদি কোনো ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সে রকম সুযোগ দেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করার বিধান থাকতে পারে। অনেকেই বলার চেষ্টা করবেন যে আজকাল তো লেখাপড়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। অবশ্যই করতে হয়। কিন্তু সেজন্য স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরি অথবা বাসার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
প্রাপ্তবয়স্কদের অতিরিক্ত ইন্টারনেট সুবিধার মূল্য বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় এক ঘণ্টা ইন্টারনেট ব্যবহারকে রাখা যেতে পারে খুবই স্বল্পমূল্যে বা সাধারণ প্যাকেজের মধ্যে। অতিরিক্ত সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করলে চড়া মূল্য দিতে হবে, যার সিংহভাগ যাবে সরকারের কোষাগারে।
আমেরিকার মতো আমাদের দেশে আদালতে মামলা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই আসক্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এ কারণেই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতির ভবিষ্যতের বিষয়টি মাথায় রেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্বিচার ব্যবহার অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করার এখনই উপযুক্ত সময়। ইতোমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর দেরি করার সুযোগ নেই। কেননা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এমন আসক্তির কারণে ক্ষতি হচ্ছে হাজার হাজার কর্ম ঘণ্টা, ঘটছে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা এবং হারিয়ে যেতে বসেছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। এর মাধ্যমে যত ভালো কিছু শিখছে, তার চেয়ে অনেক বেশি খারাপ জিনিস শিখছে। এই আসক্তি অনতিবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা