× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ববাস্তবতায় বাংলাদেশ

ভাইরাল কনটেন্ট বনাম সাংবাদিকতা

জাহিদ ইকবাল

প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুরের তরুণ তাজুল, যাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাজু নামে ইতোমধ্যে চিনে ফেলেছে লক্ষকোটি মানুষÑ তিনি আজকের বাস্তবতায় এক নতুন সময়ের প্রতীক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুরের তরুণ তাজুল, যাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাজু নামে ইতোমধ্যে চিনে ফেলেছে লক্ষকোটি মানুষÑ তিনি আজকের বাস্তবতায় এক নতুন সময়ের প্রতীক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুরের তরুণ তাজুল, যাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাজু নামে ইতোমধ্যে চিনে ফেলেছে লক্ষকোটি মানুষÑ তিনি আজকের বাস্তবতায় এক নতুন সময়ের প্রতীক। খুব সাধারণ উপস্থাপনা, স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় এবং গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এই জনপ্রিয়তা কাকতালীয় নয়; বরং এটি ডিজিটাল যুগের এক গভীর সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। আজকের বিশ্বে আর মিডিয়া মানেই বড় টেলিভিশন স্টুডিও নয়, সংবাদপত্রের অফিস নয়; একটি স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগই একজন মানুষকে পৌঁছে দিতে পারে কোটি মানুষের কাছে।

বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঘটেছে। গত এক দশকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন প্রায় ৫ থেকে ৬ কোটি মানুষ সক্রিয়ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ তাদের দৈনন্দিন তথ্য, বিনোদন এবং এমনকি সংবাদ সংগ্রহের জন্যও ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা অন্যান্য প্লাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এখন শুধু বিনোদনদাতা নন; তারা জনমত গঠনেরও একটি প্রভাবশালী অংশে পরিণত হয়েছেন।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এই পরিবর্তন আরও আগে শুরু হয়েছে এবং সেখানে এর প্রভাব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে Pew Research Center-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংবাদ গ্রহণ করে। তরুণদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। ইউরোপের দেশগুলোতেও একই প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রচলিত সংবাদ মাধ্যমের পরিবর্তে ডিজিটাল প্লাটফর্মে নির্ভরশীল। তবে এই দেশগুলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্টÑ সেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং সাংবাদিকতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা হয়েছে।

জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা কানাডার মতো দেশগুলোতে সাংবাদিকতা একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ-নির্ভর পেশা, যেখানে একজন সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে সেখানে কেউ সহজে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করতে পারে না; করলে তাকে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।

তবে বাংলাদেশে বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। এখানে সাংবাদিকতার জন্য কিছু নীতিমালা থাকলেও ডিজিটাল প্লাটফর্মে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য তেমন কোনো কার্যকর কাঠামো নেই। ফলে একজন ব্যক্তি খুব সহজেই একটি পেজ বা চ্যানেল খুলে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন। এটি একদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অংশ হলেও অন্যদিকে এটি একটি বড় ঝুঁকিও তৈরি করে, কারণ এতে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বিশ্বব্যাপী ভুয়া তথ্য বা ‘ফেক নিউজ’ এখন একটি বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় দেখা গেছে, ভুয়া খবর সত্য খবরের তুলনায় ছয়গুণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ভুয়া তথ্য সাধারণত বেশি চমকপ্রদ হয়, যা মানুষের আবেগকে দ্রুত স্পর্শ করে। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের ব্যাপক প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা হয়েছে। একইভাবে ভারত, মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজব সহিংসতার কারণ হয়েছে।

বাংলাদেশেও একাধিকবার দেখা গেছে, ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে জনমনে আতঙ্ক বা উত্তেজনা তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, কারণ পেশাদার সাংবাদিকরা তথ্য যাচাই করেন, একাধিক উৎস থেকে নিশ্চিত হন এবং একটি নির্দিষ্ট নৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করেন।

কিন্তু যখন একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর, যার মূল কাজ বিনোদন বা ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ, নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করেন, তখন এই পুরো ব্যবস্থায় একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। দর্শক বুঝতে পারেন না কোনটি যাচাইকৃত তথ্য এবং কোনটি ব্যক্তিগত কনটেন্ট। ফলে একটি ভাইরাল ভিডিওকেও অনেকেই ‘সংবাদ’ হিসেবে গ্রহণ করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

অন্যদিকে, ‘সিটিজেন জার্নালিজম’ বা নাগরিক সাংবাদিকতার ধারণা বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ এখন ঘটনাস্থল থেকে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারছেন। এটি তথ্যপ্রবাহকে গতিশীল করেছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতা এবং পেশাদার সাংবাদিকতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নাগরিকরা তথ্যের উৎস হতে পারেন, কিন্তু সেই তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ এবং দায়িত্বশীল উপস্থাপনার দায়িত্ব পেশাদার সাংবাদিকদের ওপরই বর্তায়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশে অনেক তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, কারণ এতে দ্রুত জনপ্রিয়তা এবং আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সাংবাদিকতা পেশায় রয়েছে কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নানা ধরনের চাপ। ফলে কিছু মানুষ সহজ পথ বেছে নিয়ে কনটেন্ট ক্রিয়েশন করলেও পরিচয়ের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মর্যাদা ব্যবহার করতে চান। বাংলাদেশেও এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। শুধু আইন করলেই হবে না; মানুষকে সচেতন করতে হবে, শিক্ষাব্যবস্থায় মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পেশাদার সাংবাদিকতার মান উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাজুর মতো কনটেন্ট ক্রিয়েটররা এই সময়ের বাস্তবতা। তারা মানুষের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করছেন, সামাজিক যোগাযোগের নতুন ভাষা তৈরি করছেন। কিন্তু তাদের এই ভূমিকা সাংবাদিকতার সঙ্গে মিশে গেলে সেটি আর শুধু একটি ব্যক্তিগত পরিচয়ের বিষয় থাকে না; এটি একটি পেশার মর্যাদা এবং সমাজের তথ্যব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে।

সাংবাদিকতা কখনোই শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা নয়। এটি একটি গভীর প্রক্রিয়া, যেখানে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপনার প্রতিটি ধাপে দায়িত্ববোধ কাজ করে। ডিজিটাল যুগ আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের স্পষ্টভাবে বুঝতে হবেÑ কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং সাংবাদিকতা দুটি আলাদা ক্ষেত্র। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা না গেলে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হব, যেখানে সত্য এবং বিনোদনের সীমারেখা মুছে যাবে, আর সেটি কোনোভাবেই একটি সুস্থ সমাজের জন্য ভালো লক্ষণ নয়।

তাই বলা যায়, সবাই কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে পারে, এটি একটি উন্মুক্ত ক্ষেত্র। কিন্তু একজন প্রকৃত সাংবাদিক হতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের সাধনা, নৈতিকতা, পেশাদারত্ব এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি। ভাইরাল হওয়া সহজ, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য হওয়া কঠিনÑ আর সাংবাদিকতার মূল শক্তি এখানেই।


জাহিদ ইকবাল

সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা