আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫৬ এএম
বাংলাদেশ আজ একটি সম্ভাবনার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের অদৃশ্য শৃঙ্খল। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাষ্ট্র যখন সুশাসন, ন্যায়বিচার ও উন্নয়নের পথে হাঁটে, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ দাঁড়ায় এক অদৃশ্য শক্তি। যা সব সময়ই থাকে আড়ালেÑ ক্ষমতার ছায়ায়, অর্থের জালে, প্রভাবের বলয়ে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই অদৃশ্য কিন্তু ভয়ংকর শক্তির নাম সিন্ডিকেট। এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক কারসাজির বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে-বাইরে ছড়িয়ে থাকা এক ধরনের সংগঠিত স্বার্থগোষ্ঠী, যারা নিজেদের মুনাফার জন্য পুরো ব্যবস্থাকেই জিম্মি করে রাখে।
আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নের গল্প যতটা উচ্চকিত, তার অন্তরালে ততটাই তীব্র এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা কাজ করছেÑ সিন্ডিকেটের নির্মম আধিপত্য। বাজারে গেলেই তার প্রমাণ মেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হঠাৎ করে বাড়ে, আবার কখনও কমে কিন্তু এই ওঠানামার পেছনে প্রকৃত কারণ হিসেবে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদাÑ জোগান নয়, বরং কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ইচ্ছাই বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজÑ সবকিছুর ক্ষেত্রেই একই চিত্র। যেন অদৃশ্য কোনো বোর্ডরুমে বসে সিদ্ধান্ত হয়Ñ আজ কোন পণ্যের দাম কত হবে, আর সাধারণ মানুষ কতটা কষ্ট পাবে।
এই সিন্ডিকেট শুধু ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি প্রশাসনের ভেতরেও গভীরভাবে প্রোথিত। আমলাতন্ত্রের একটি অংশ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমন এক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থই হয়ে উঠেছে প্রধান চালিকাশক্তি। ফাইল আটকে রাখা, অনুমোদন বিলম্বিত করা, কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করাÑ এসব যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। ফলে সরকারের নীতি যতই জনমুখী হোক না কেন, বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে তা বিকৃত হয়ে যায়। উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে, ব্যয় বেড়ে যায়, আর জনগণ বঞ্চিত হয় প্রত্যাশিত সুফল থেকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলোÑ রাজনৈতিক প্রভাবের ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেটগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থান করা কিছু গোষ্ঠী ব্যবসা, প্রশাসন এবং রাজনীতিকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। তারা একদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, অন্যদিকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করে, আর তৃতীয় দিকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখে। এই ত্রিমুখী জোট ভেঙে না দিলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট এখন আর নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিবছরই কোনো না কোনো পণ্য নিয়ে একই নাটক মঞ্চস্থ হয়। কখনও বলা হয় উৎপাদন কম, কখনও আমদানিতে সমস্যা কিন্তু পরে দেখা যায়, গুদাম ভরা পণ্য লুকিয়ে রাখা হয়েছিল শুধু দাম বাড়ানোর জন্য। এই ধরনের নির্মম মুনাফালোভী আচরণ শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি নৈতিকতারও চরম অবক্ষয়। কারণ এর সরাসরি শিকার হয় সাধারণ মানুষ, যাদের আয়ের বড় অংশই খরচ হয়ে যায় খাদ্য কেনার পেছনে।
সরকার মাঝে মাঝে অভিযান চালায়, জরিমানা করে, কিছু ব্যবসায়ীকে শাস্তি দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এসব কি সমস্যার মূল সমাধান? নাকি এটি কেবল উপসর্গের চিকিৎসা? বাস্তবতা হলো, সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক, কঠোর এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ পদক্ষেপ। বিচ্ছিন্ন অভিযানে কিছুদিনের জন্য বাজার স্বাভাবিক হলেও, খুব দ্রুতই সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সরকারি প্রকল্পগুলোতেও সিন্ডিকেটের প্রভাব স্পষ্ট। ঠিকাদারি কাজ বণ্টন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে একই গোষ্ঠীর প্রভাব দেখা যায়। এতে প্রতিযোগিতা কমে যায়, ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, আর কাজের মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। জনগণের করের টাকায় নির্মিত প্রকল্পগুলো তখন হয়ে ওঠে কিছু গোষ্ঠীর মুনাফার উৎস।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো- এটি ধীরে ধীরে একটি ‘স্বাভাবিক’ বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। মানুষ যেন ধরে নিয়েছেÑ দাম বাড়বে, সিন্ডিকেট কাজ করবে, আর কিছুই করার নেই। এই মানসিকতা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবেÑ সমস্যাটি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক। এটি কোনো একক খাতের সমস্যা নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে, সরবরাহ চেইনকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং মজুদদারির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
প্রশাসনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদি প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। সিন্ডিকেটের সঙ্গে আপস করে, কিংবা তাদের নীরবে সহ্য করে, কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কারণ এই শক্তি শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দুর্বল করে দেয়Ñ জনগণের আস্থা নষ্ট করে, অর্থনীতিকে অস্থির করে, এবং উন্নয়নের গতি থামিয়ে দেয়।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে আরও সাহসী ভূমিকা নিতে হবে। সত্য প্রকাশের ঝুঁকি থাকলেও, সিন্ডিকেটের মুখোশ উন্মোচন করা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। কারণ আলোতেই অন্ধকার দুর্বল হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম কার্যত সেই সিন্ডিকেটের দখলে চলে গেছে।
বাংলাদেশ আজ একটি সম্ভাবনার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের অদৃশ্য শৃঙ্খল। এই দুইয়ের সংঘর্ষে শেষ পর্যন্ত কোনটি জয়ী হবে, তা নির্ভর করছে আমাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তাহলে উন্নয়নের সব অর্জনই ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। আর যদি দৃঢ়তার সঙ্গে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ সত্যিকারের সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
সুতরাং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে সফল হতে হলে অবশ্যই এই ভয়ংকর শত্রু সিন্ডিকেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। অন্যথায় দিনশেষে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগই সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছবে না।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক