কর্মজীবী
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব ও দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫১ এএম
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের একটি বড় অংশ মাতৃত্বের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জননী ও কর্মজীবীÑ এই দুই সত্তার মাঝে এক অদৃশ্য কাচের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, যা প্রতিদিন তিলে তিলে বিদ্ধ করে বাংলাদেশের হাজারো স্বপ্নচারী নারীকে। কবি নজরুল যখন লিখেছিলেন, ‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’, তখন হয়তো তিনি সেই ত্যাগের গভীরতা মেপেছিলেন। কিন্তু আজকের ২০২৬ সালের রূঢ় বাস্তবতায়, একজন মা যখন তার কোলের সন্তানকে ঘরে রেখে অফিসের লিফটে চড়েন, তখন তার মনের গহিনে চলে এক ভয়াবহ ‘মাতৃত্বের দহন’। ক্যারিয়ারের শীর্ষ ছোঁয়া আর মাতৃত্বের পূর্ণতা দেওয়াÑ এই দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে গিয়ে নারী আজ এক অন্তহীন দোটানায় বন্দি।
পরিসংখ্যানের আয়নায় নিষ্ঠুর বাস্তবতা
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের একটি বড় অংশ মাতৃত্বের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বিবিএসর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪০-৪৫% কর্মজীবী নারী সন্তান জন্মদানের পর পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পারেন না। এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে উপযুক্ত ‘চাইল্ড কেয়ার’ বা ডে-কেয়ার সেন্টারের অভাব। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের মাত্র ১০%-এরও কম সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত ডে-কেয়ার সুবিধা রয়েছে। একজন উদ্যোক্তা নারীর জন্য চ্যালেঞ্জটা আরও প্রকট; পর্যাপ্ত পারিবারিক সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে প্রায় ৩০% নারী উদ্যোক্তা তাদের স্বপ্নের স্টার্টআপটি অকালে বন্ধ করে দেন শুধু মাতৃত্বকালীন চাপের কারণে।
দ্বিমুখী যুদ্ধের বিভিন্ন মাত্রা
অফিস নাকি সন্তানÑ এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতের টানাপড়েনে ক্ষয়ে যাওয়া এক অদৃশ্য মানচিত্রের নাম ‘মা’। যখন কর্মক্ষেত্রের কঠিন পেশাদারত্ব আর সন্তানের গায়ের তপ্ত জ্বর একই বিন্দুতে এসে মেশে, তখন দুচোখের প্রশান্তির ঘুম বিসর্জন দিয়ে শুরু হয় এক অন্তহীন আত্মদহন, যা বাইরের পৃথিবীর কাছে অধরাই থেকে যায়। দিনশেষে সমাজ যাকে ‘সফল নারী’ বলে হাততালি দেয়, সেই প্রতিটি সাফল্যের ইটে আসলে জমা থাকে একজন মায়ের হাজারো নিঃশব্দ অশ্রু আর নিজের অস্তিত্বকে প্রতিদিন তিলে তিলে বিলিয়ে দেওয়ার এক মায়াবী অথচ নিদারুণ ত্যাগের গল্প।
অপরাধবোধের অন্তহীন দহন
অফিসের জরুরি মিটিংয়ে যখন কোনো মা প্রেজেন্টেশন দেন, তখন তার অবচেতন মন পড়ে থাকে বাড়িতে পড়ে থাকা অসুস্থ শিশুটির কপালে। এই যে ‘গিল্ট’ বা অপরাধবোধ, তা কেবল মানসিক চাপ নয়, বরং এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যাতনা। অনেক সময় সহকর্মীদের বাঁকা চাহনি বা ‘বাচ্চা রেখে কাজ করা কি খুব দরকার?’Ñ এমন বিদ্রূপাত্মক প্রশ্ন একজন মায়ের আত্মবিশ্বাসকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়।
অবকাঠামোগত শূন্যতা
মাতৃত্ব কেবল একটি আবেগ নয়, এটি একটি শারীরিক ও কাঠামোগত প্রয়োজন। অনেক অফিসে আজও ব্রেস্টফিডিং কর্নার বা ব্রেস্ট মিল্ক পাম্প করার মতো ন্যূনতম গোপনীয়তা ও ব্যবস্থা নেই। ফলে শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক অস্বস্তি নিয়ে কাজ করতে হয়। ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিবের সেই ‘ক্রমাগত দ্বিধা’র মতো, প্রতি পদে মনে হয়Ñ ‘আমি কি তবে ভুল পথে এগোচ্ছি?’
উদ্যোক্তা মায়ের একাকী লড়াই
একজন নারী উদ্যোক্তার জন্য ছুটি বলে কিছু নেই। যখন ব্যবসার প্রসারে বিনিয়োগকারীর পেছনে ছোটার কথা, তখন তাকে হয়তো ছুটতে হয় সন্তানের ভ্যাকসিনের জন্য। সমাজ মনে করে ব্যবসা তো নিজের, যখন খুশি সময় দেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যবসার সূচনালগ্ন আর মাতৃত্বের প্রাথমিক পর্যায়Ñ উভয়ই সমান মনোযোগ দাবি করে। এই দুই ফ্রন্টে লড়াই করতে গিয়ে অনেক মেধাবী নারী মাঝপথে তার ‘স্বপ্নের তরী’ ডুবিয়ে দিতে বাধ্য হন।
আর্থিক স্বাধীনতা ও ত্যাগের মহিমা
নারী যখন কর্মক্ষেত্রে সফল হন, তখন তার সেই সাফল্য কেবল তার একার নয়; গবেষণায় দেখা গেছে, একজন উপার্জনক্ষম মা তার আয়ের ৯০% পরিবারের পুষ্টি ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় করেন। কিন্তু এই আর্থিক স্বাধীনতার মূল্য তাকে দিতে হয় নিজের ঘুম, বিশ্রাম আর মানসিক স্বাস্থ্যের বিনিময়ে। একজন মা দিনে গড়ে ৭ ঘণ্টা বিনাশ্রমের কাজ করেন, যা তার পেশাগত দক্ষতার ওপর এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আগামীর প্রত্যাশা
মাতৃত্ব কোনো দুর্বলতা নয়, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৃজনশীল শক্তি। একজন মা যখন একটি জীবনকে লালন করেন, তখন তিনি একই সাথে সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে:
• প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করতে হবে।
• ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং আওয়ার এবং দূরবর্তী কাজের (Remote Work) সুযোগ বাড়াতে হবে।
• পিতৃত্বকালীন ছুটির (Paternity Leave) প্রচলন করতে হবে, যাতে বাবাও সন্তানের লালনপালনে সমান অংশীদার হতে পারেন।
দিনশেষে মাতৃত্ব যেন কোনো নারীর ক্যারিয়ারের সমাধি না হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন মনের অলিগলিতে সেই যে হাহাকারÑ‘কিছু দরজা একবার বন্ধ হলে তা চিরতরেই তালাবন্দি থেকে যায়’Ñ তা যেন কোনো কর্মজীবী মায়ের ক্ষেত্রে সত্য না হয়। সমাজ যদি আজ তার পাশে না দাঁড়ায়, তবে আমরা কেবল একজন কর্মীকে হারাব না, বরং একটি সমৃদ্ধিশালী ও টেকসই অর্থনীতির সম্ভাবনাকেই ধূলিসাৎ করে দেব।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান
রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়