× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উত্তরাঞ্চলের কৃষির পুনর্জাগরণ ও কৃষকবান্ধব রাজনীতি

ড. মো. সহিদুজ্জামান

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ২০:০৯ পিএম

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ২১:২৭ পিএম

ড. মো. সহিদুজ্জামান। ফাইল ছবি

ড. মো. সহিদুজ্জামান। ফাইল ছবি

কৃষিনির্ভর আমাদের এই দেশের মাটির উর্বরতাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তাছাড়া এই দেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়াও যেন সোনায় সোহাগা। মাটির ধরন ও আবহাওয়ার ভেদে কৃষি উৎপাদনের পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। দেশের উত্তরাঞ্চলের কথা চিন্তা করলে তা আরও বেশি সত্য। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে মৌসুমে যখন ফলন ভালো হয় তখনও তা প্রক্রিয়াজাত করতে না পারায় আমাদের কৃষকদের ভাগ্যের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না।

বাংলাদেশের উর্বর মাটি মূলত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বহন করা পলি জমে গঠিত। লবণাক্ত পানির সঙ্গে মিশে এই পলি স্থিতিশীল হয়ে ডেল্টা তৈরি করেছে, যা পৃথিবীর বৃহত্তম ডেল্টা। উত্তরাঞ্চলের মাটি তিস্তা প্লাবনভূমি, হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমি, বরেন্দ্র টেরেস ও গঙ্গা প্লাবনভূমি থেকে গঠিত। 

তবে বরেন্দ্র মাটি অপেক্ষাকৃত অনুর্বর হওয়ায় সেচ ও সার দরকার। এ অঞ্চলের জলবায়ু উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় মৌসুমি, গড় তাপমাত্রা ২১–৩১°সে.। বৃষ্টিপাত ২০০০-২৫০০ মিমি। এই পরিবেশ ধান, গম, ভুট্টা, আলু ও আম চাষে অনুকূল হলেও খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি আছে। দেশের ধান, ভুট্টা ও আলুর বড় অংশ উত্তরাঞ্চলেই উৎপাদিত হয়। তবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ে। কোল্ডস্টোরেজ সীমিত, ভাড়া বেড়েছে, ফলে উৎপাদন খরচের নিচে কৃষকদের পণ্য বিক্রি করতে হয়। এতে প্রায় ২০–৩০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় মাত্র ২ শতাংশ, যা খুব কম। আধুনিক শিল্প, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে কৃষকের ক্ষতি কমিয়ে কৃষির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।

এসব সমস্যার সমাধানের জন্য পাঁচটি ধাপে সমাধানের দিকে যাওয়া সম্ভব। প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি। কারণ আলু ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের উৎপাদন অনেক বেশি হলেও পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে বড় ধরনের post-harvest loss ঘটে। এই অঞ্চলে বছরে উৎপাদিত আলুর সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র প্রায় ২.৩ মিলিয়ন টনের মতো অর্থাৎ মোট উৎপাদনের প্রায় ২৫%-এরও কম সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে অধিকাংশ কৃষককে ফসল কাটার পরপরই বাজারে বিক্রি করতে হয় তখন অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক ও ছোট-মাঝারি কোল্ড স্টোরেজ, সমবায়ভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং উন্নত সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করলে ফসল দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এবং কৃষকের ক্ষতি কমানো যাবে।

দ্বিতীয়ত, উত্তরাঞ্চলের কৃষি সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও বিস্তৃত করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে আলুর উৎপাদন প্রায় ১১.৫৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছেছে। কিন্তু দেশের ভেতরে আলুর চাহিদা প্রায় ৯ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি থাকায় প্রতি বছর প্রায় ২.৫ থেকে ৩ মিলিয়ন টন আলু অতিরিক্ত থেকে যায়। বাস্তবতা হলো, এত বড় উৎপাদনের খুব সামান্য অংশ মাত্র প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ, শিল্পখাতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে মোট উৎপাদনের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আলু বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এই কারণে অতিরিক্ত উৎপাদিত আলুর বেশিরভাগই সরাসরি বাজারে চলে আসে। ফলে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে যায়। যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বড় পরিসরে প্রসেসিং কারখানা গড়ে তোলা যায়, তাহলে আলু থেকে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফ্লেক্স ও স্টার্চের মতো পণ্যের উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভুট্টা ব্যবহার করে পশুখাদ্য ও অন্যান্য শিল্পজাত পণ্যও তৈরি করা যেতে পারে। এতে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং উদ্বৃত্ত ফসলকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেওয়া সহজ হবে। 

তৃতীয়ত, উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করার জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সমবায়ভিত্তিক সংগঠন গঠন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেকই কৃষিতে নিয়োজিত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষকের জমি খুব ছোট, অনেকের ক্ষেত্রেই এক হেক্টরের কম। এর ফলে তারা একা বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে না এবং প্রায়ই তাদের ফসলের ন্যায্য দামও পান না।

এক্ষেত্রে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থা বেশ কার্যকর। একসঙ্গে উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বিক্রয় করলে কৃষকের খরচ কমে যায়, আবার ফসলের বাজার মূল্যও বাড়ে। সেই সঙ্গে যদি কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ, ফসলের মান যাচাই, গ্রেডিং, প্যাকেজিং এবং বাজারজাতকরণের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তাহলে তাদের উৎপাদনশীলতা আরও বাড়ানো সম্ভব। বিভিন্ন প্রকল্পের ফলাফলও দেখিয়েছে, সেসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন প্রায় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

চতুর্থ বিষয়, উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনকে স্থিতিশীল রাখতে বাজার বাড়ানো আর ভালো সাপ্লাই চেইন বানানো খুব জরুরি। বাংলাদেশে ফসল কাটার পর অনেকটা নষ্ট হয়ে যায় কারণ পরিবহন, রাখার জায়গা আর বাজারে নেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল। 

সর্বশেষ, পঞ্চম বিষয় হলো, উত্তরাঞ্চলে কৃষি গবেষণায় ব্যাপক বরাদ্দ প্রয়োজন কারণ এ অঞ্চলে খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি ও জলস্বল্পতার মতো সমস্যা বেশি দেখা যায়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় খরা-সহনশীল জাত, আধুনিক সেচব্যবস্থা ও উন্নত চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন জরুরি। গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ফসলের বৈচিত্র্য আনা এবং কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব, যা অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি বিষয়ক গবেষণায় বিনিয়োগকৃত অর্থের সর্বনিম্ন ৮ থেকে ৯ গুণ সুফল পাওয়া যায়। কারণ, নতুন প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, পোকা-রোগ নিয়ন্ত্রণ করে, প্রসেসিং আরও ভালো করে।

তবে এই প্রেক্ষাপটে আশার আলো জ্বালিয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি কৃষকদের জন্য “কৃষক কার্ড” ব্যবস্থার কথা জানিয়েছেন। ‘কৃষক কার্ড’ এর মাধ্যমে ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা সহজে ঋণ, সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাবেন। এছাড়া কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ- বিএনপির সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপরন্তু ফসল তৈরি আর বাজারে নেওয়ার সময়ও কৃষকরা সাহায্য পাবে যা খরচ কমাবে একইসঙ্গে আয় বাড়াবে। 

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উত্তরাঞ্চলে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ বানানোর পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সভায় তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরে ভালো স্টোরেজ বানিয়ে ফসলের নষ্ট হওয়া কমাবেন আর মার্কেট সাপ্লাই স্থিতিশীল করবেন। প্রধানমন্ত্রীর মতে, কৃষকরা লম্বা সময় ফসল রাখতে পারলে তাড়াহুড়ো করে সস্তায় বেচতে হবে না, দামও স্থিতিশীল থাকবে। এছাড়া সমগ্র উত্তরাঞ্চলকে অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজশাহী, দিনাজপুর, পঞ্চগড়ে কৃষিভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেডে কাঁচা মাল থেকে প্রক্রিয়াজাত আর ভ্যালু-অ্যাডেড প্রোডাক্ট বানাবেন। এতে ওই এলাকার মানুষদের কর্মসংস্থান বাড়বে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার আসবে, কৃষকের আয় বাড়বে। তিনি আরও বলেছেন, পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ ও বরেন্দ্র প্রজেক্ট পুনরায় চালু করবেন। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ শক্তিশালী হবে। বর্ষায় পানি সংরক্ষণ, শুষ্ককালে কৃষিকাজ চালানো সহজ হবে। তিনি জনসভায় বলেছিলেন, “বরেন্দ্র প্রকল্প যেটা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। এই বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করার পরেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় দেশ দ্বিগুণ খাদ্য উৎপাদন করে। সেই বরেন্দ্র প্রকল্প প্রায় বন্ধের অবস্থায়। সঠিকভাবে আবার এই এলাকার খালগুলোকে আমরা খনন করতে চাই, পদ্মা নদীকে আমরা খনন করতে চাই”।

উত্তরাঞ্চলের কৃষির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কৃষকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘কৃষক কার্ড’, কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো, অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব এবং বরেন্দ্র-পদ্মা ব্যারেজের মতো প্রকল্পগুলো ঠিকমতো চালু হলে কৃষকদের আয় বাড়বে, ফসল নষ্ট কমবে এবং ওই এলাকার অর্থনীতি মজবুত হবে। উপরে উল্লিখিত পাঁচটা পদক্ষেপ (সংরক্ষণ পদ্ধতি উন্নত করা, প্রক্রিয়াকরণ বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ও সমবায় গড়া, সাপ্লাই চেইন শক্ত করা, এবং গবেষণায় বরাদ্দ দেওয়া) যদি মানা হয়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি দেশের সব দিকের উন্নয়নেও বড় ভূমিকা পালন করবে। কৃষকদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে এর কোনো বিকল্প নেই! কারণ আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি আমাদের সবুজ বিপ্লবে।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা