ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৫ পিএম
দের সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে অনেক চালক বিশ্রাম না নিয়েই গাড়ি চালান, যা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঈদ আনন্দ, মিলন আর ঘরে ফেরার উৎসব। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, প্রতিবছর ঈদযাত্রা যেন এক নীরব মৃত্যুমিছিলে পরিণত হয়। এবারের ঈদযাত্রায়ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। গত ১৫ দিনে সারা দেশে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের প্রাণহানির খবর জাতিকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা এক একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি জীবনের করুণ সমাপ্তি। বাংলাদেশে ঈদ ঘিরে অতিরিক্ত যাত্রীচাপ, অব্যবস্থাপনা এবং সড়কে নিরাপত্তাহীনতা নতুন কিছু নয়। এই বাস্তবতা মেনেই প্রতিবছর ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে সকল যাত্রাপথে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল জনস্রোত সামাল দিতে আমাদের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর? বাস্তবতা হলো, দেশের সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এখনও দুর্বল। ফলে দুর্ঘটনা যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
৩১ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে দুর্ঘটনায় ৩৯৪ মৃত্যু’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের ঈদযাত্রায় ১৪ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৫ দিনে সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জনের মৃত্যু ও এক হাজার ২৮৮ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সড়কে ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত ও এক হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে সংগঠনটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। ঈদযাত্রায় ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩৫ জন নিহত ও ১১৪ জন আহত হয়েছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এতে আরও বলা হয়, ১৫ দিনে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত, নৌপথে আটটি দুর্ঘটনায় আটজন নিহত ও তিনজন নিখোঁজ হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় যানবাহনের মধ্যে ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে এবং ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ বাস। দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী, ৩৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ ও ৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে পথচারী চাপা পড়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে ঘটে। যাত্রী কল্যাণ সামতির দাবি, এবারও সিন্ডিকেটের প্রভাবে ঈদে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। সরকার নতুন হলেও পরিবহন সেক্টরে সেই পুরনো মাফিয়াদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাব রয়ে গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানো, চালকদের ক্লান্তি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়কে শৃঙ্খলার অভাব। ঈদের সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেশি ট্রিপ দিতে গিয়ে অনেক চালক বিশ্রাম না নিয়েই গাড়ি চালান, যা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল; জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়ক বাতি না থাকা; পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ ট্রাক বা ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত করেছে। অনেক সময় অনভিজ্ঞ বা লাইসেন্সবিহীন চালকদের উপস্থিতিও দুর্ঘটনার হার বাড়িয়ে দেয়।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। যদিও প্রশাসন ঈদ সামনে রেখে নানা উদ্যোগ নেয়, কিন্তু তা অনেক সময়ই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে সড়কে কঠোর নজরদারি ও নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। ফলে আইন ভঙ্গকারীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এ ছাড়া, গণপরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের উপস্থিতিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সড়কে পৃথক লেনের অভাব এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
অবস্থার পরিবর্তনে সড়ক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, যাত্রীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে যাত্রীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো জরুরি। সিসিটিভি নজরদারি, স্পিড ক্যামেরা এবং ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ঈদ আনন্দের উৎসবÑ এটি কোনোভাবেই শোকের কারণ হোক আমরা চাই না। এবার সড়ক, রেল ও নৌÑ সকল পথেই দুর্ঘটনা বেড়েছে। তাই সব যাত্রাপথেই নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। নয়তো প্রতিবছরই ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যাবে অসংখ্য প্রাণহানির কারণে। আমরা চাই, সবার ঈদযাত্রা হোক নিরাপদ ও স্বস্তির। সড়ক, রেল ও নৌপথে কোনো দুর্ঘটনা নয়— এটাই সবার প্রত্যাশা। তাই চালক, যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমরা মনে করি, নিয়ম মেনে চলা, সতর্কতা ও সচেতনতাই পারে প্রাণহানি রুখতে এবং ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে।