অর্থনীতি
ড. মো. আইনুল ইসলাম
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৪ পিএম
ড. মো. আইনুল ইসলাম, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্ব অর্থনীতি যখন এক বহুমাত্রিক অনিশ্চয়তা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, তখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের আসন্ন বাজেট বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিপথ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের এই সন্ধিক্ষণে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নীতি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। কৃষি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য নিরাপত্তা ও রপ্তানি প্রণোদনার মতো কৌশলগত খাতে সরকারি সহায়তা দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করলেও বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, অভ্যন্তরীণ আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নীতির অপপ্রয়োগের বিষয়টি নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ইরান-সংকট এবং লোহিত সাগরের নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি, বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক ঋণের কারবারি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ভর্তুকি নিয়ে খবরদারি যৌক্তিক কারণেই দেশের ‘ভর্তুকি দর্শন’ নতুন বিন্যাসে সাজানোর অপরিহার্যতা সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি ‘ভর্তুকি দর্শন’ গ্রহণ করা, যা একদিকে দেশের উৎপাদনশীল খাত ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেবে এবং অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে ভর্তুকির ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ঐতিহাসিকভাবে তিনটি প্রধান লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছেÑ খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং শিল্প উৎপাদনকে প্রতিযোগিতামূলক করা। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষি খাতে সারের ভর্তুকি এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণই মূলত খাদ্য ঘাটতির একটি দেশকে আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তা বাজেট ব্যবস্থাপনার জন্য এক বিশাল সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, এলএনজি ও জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং বিদ্যুৎ খাতের ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’-এর মতো কাঠামোগত অদক্ষতার কারণে সরকারকে বিপুল অঙ্কের বকেয়া ভর্তুকি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় সত্তর হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিপুল ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সরকার যখন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শে জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পথে হাঁটে, তখন তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। এটি একধরনের ‘দুষ্টচক্র’, যেখানে সংস্কারের নামে জনস্বার্থ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের সুফল সাধারণ মানুষের বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তগত হয়। ভর্তুকি নিয়ে এই যে উভয়সংকট, তা সমাধানের জন্য কেবল ব্যয় সংকোচন নয়, বরং সরকারি ব্যয়ের দর্শনে একটি আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বদৌলতে প্রতিবছর ভর্তুকি নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হতে দেখা যায়, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে দ্বৈতনীতি। অনেক সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভর্তুকি কমানোর জন্য চাপ দিলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতিগুলো কৌশলগত খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফার্ম বিল’ বা ইউরোপের ‘কমন এগ্রিকালচারাল পলিসি’ (সিএপি) এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে কৃষকদের আয় ও খাদ্য উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি কমানোর ঢালাও প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে অনুসরণ না করে বরং দেশীয় প্রেক্ষাপট ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ভর্তুকির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্কের বড় সুযোগ রয়েছে। এর কারণ, বণ্টনের ন্যায্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বজনীন ভর্তুকি কাঠামোর ফলে দরিদ্র মানুষের তুলনায় উচ্চবিত্ত ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোই বেশি সুবিধা পেয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি ভর্তুকি যখন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়, তখন যে পরিবারটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে, সে একজন প্রান্তিক শ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশি রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করে।
আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো প্রায়শই রাজস্ব ঘাটতি কমানোর দোহাই দিয়ে জনসেবামূলক খাতগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণ বা ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এ ধরনের পুঁজিবাদী সংস্কারের আড়ালে বেশিরভাগ সময় বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা ও মুনাফা অর্জনের পথ প্রশস্ত করা হয়। যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবাগুলোকে মুনাফামুখী খাতে পরিণত করা হয়, তাহলে তা সাধারণ মানুষের কাছে মৌলিক অধিকার প্রাপ্তিতে প্রবেশাধিকার সংকুচিত হয়। সরকার যখন ধনীদের কাছ থেকে যথাযোগ্য কর না নিয়ে কিংবা ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে সংসদে বসে আইন করে জনগণের অর্থ নয়ছয় করে, নিজের কর আদায়ের ব্যর্থতায় বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে এবং তার শর্ত পূরণে জনগণের ওপর দাম বৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দেয়, তখন তা সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে নড়বড়ে করে দেয়, যা বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে কোনো সরকারের স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ ও ত্যাগ করতে না পারার মাধ্যমে অনেক আগেই প্রমাণ হয়েছে।
আধুনিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ‘বাজার ব্যর্থতা’ নিরসনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা প্রথম স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন জন মেইনার্ড কেইনস। তার ‘কেইনসীয় অর্থনীতি’র আলোকে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের ভর্তুকি একটি শক্তিশালী ‘কাউন্টার-সাইক্লিক্যাল পলিসি ইনস্ট্রুমেন্ট’ হিসেবে কাজ করে, যা বৈশ্বিক মন্দা বা মূল্যস্ফীতির সময় বাজারকে স্থিতিশীল রাখে। এই একই কল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায় অমর্ত্য সেনের ‘ক্যাপাবিলিটি অ্যাপ্রোচ’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধি তত্ত্বে। সেনের মতে, উন্নয়নের মাপকাঠি কেবল আয় নয়, বরং মানুষের মৌলিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের টিসিবি কার্যক্রম বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি মূলত এই তত্ত্বেরই প্রয়োগ, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যূনতম জীবনমান বজায় রাখে। আবার পল রোজেনস্টাইন-রোডানের ‘বিগ পুশ থিউরি’ অনুযায়ী, শিল্পায়নের প্রাথমিক স্তরে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বা রপ্তানি প্রণোদনা ছাড়া শিল্প খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না; বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রদত্ত নগদ সহায়তা এই তত্ত্বেরই বাস্তব উদাহরণ। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতির বিচারে ডগলাস নর্থ দেখিয়েছেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করে না, বরং সঠিক নীতিকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির বিশাল অঙ্কের পেছনে বেশিরভাগ সময় প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী থাকে, যা কেবল মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিউরি’ বা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, ভর্তুকি অনেক সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে খাদ্য ও জ্বালানির দামের আকস্মিক বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। তাই রাষ্ট্র ভর্তুকির মাধ্যমে জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে রাজনৈতিক বৈধতা বজায় রাখে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে, যা জেমস বুকাননের ‘পাবলিক চয়েস থিউরি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সরকারি নীতি অনেক সময় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বা প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে লক্ষ্যচ্যুত হয়। ফলে ভর্তুকি প্রকৃত দরিদ্রের কাছে না পৌঁছে প্রভাবশালী বা বিত্তবানদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যাকে অর্থনীতিতে ‘মিসঅ্যালোকেশন অব রিসোর্সেস’ বা সম্পদের অপবণ্টন বলা হয়।
হিসাববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাপনায় একটি ‘ফিসকাল লেজিটিমেসি ডিলেমা’ তৈরি করেছে। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ার ফলে এই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সংকট তৈরির ঝুঁকি বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভর্তুকি পুরোপুরি প্রত্যাহার নয়, বরং এর গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। এসব কারণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের জন্য ‘স্মার্ট সাবসিডি রিফর্ম’ বা সময়োপযোগী সংস্কারই হবে শ্রেষ্ঠ পথ।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও নতুন সরকারের ভর্তুকি দর্শন হওয়া উচিত একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ। কেবল বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য যান্ত্রিকভাবে ভর্তুকি কমানো হলে তা উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস নামাতে পারে। এর পরিবর্তে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও তথ্যনির্ভর লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করে রাজস্ব ভিত্তি মজবুত করা এবং অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে নিহিত। একটি আধুনিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রে ভর্তুকি কোনো দান বা দয়া নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব, যা বাজার ব্যবস্থার অসামঞ্জস্য দূর করে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা প্রদান করে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট যদি এই ভর্তুকি দর্শনকে সঠিকভাবে ধারণ করতে পারে, তবেই নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে সক্ষম হবে।
ড. মো. আইনুল ইসলাম
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়