× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সড়ক দুর্ঘটনা

অর্থনীতির নীরব ঘাতক

সাদেকুর রহমান

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বেপরোয়া ড্রাইভিং, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বেপরোয়া ড্রাইভিং, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। আমরা প্রতিদিনের জীবন যাপনের জন্য রাস্তায় বের হই। এক স্থান হতে অন্য স্থানে গমন করি। এই যাতায়াতের জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করি। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় যে, আজ কতজন দুর্ঘটনায় আহত কিংবা নিহত হয়েছে। ঈদ আমাদের জন্য নিয়ে আসে অনাবিল আনন্দ। কিন্তু আনন্দের মধ্যে অনেকের জীবনে বিষাদের ছায়া হয়ে আঘাত করে সড়ক দুর্ঘটনা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন হিসাব অনুযায়ী, এই ঈদের ছুটিতে সারা দেশে ২৬৪টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। এতে ২০৪ জন নিহত ও ৬০০ জনের বেশি আহত হয়। 

দেশে প্রতিবছর কয়েক হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। আর আহত হয় আরও কয়েক হাজার। শুধু যে মানবসম্পদের ক্ষতি হচ্ছে তাই নয়, এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও অনেক। বিভিন্ন গবেষণা হতে জানা যায় যে, সড়ক দুর্ঘটনাজনিত কারণে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়ে থাকে। বাংলাদেশ যাত্রী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকারও বেশি ।

অর্থনীতিবিদরা সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাবকে ২ ভাগে ভাগ করে থাকেন। এগুলো হলোÑ  ১। প্রত্যক্ষ প্রভাব ও ২। পরোক্ষ প্রভাব। সড়ক দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব হলোÑ জীবনহানি, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যয়, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে হিসাব করা হয় যানবাহন ও অবকাঠামোগত। পরোক্ষ অর্থনৈতিক কারণগুলো হলো যানজটের কারণে সময়ের অপচয়, পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময়, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় ও দরিদ্রতা বৃদ্ধি, সামাজিক অস্থিরতা।

কর্মক্ষম মানুষের অকালমৃত্যু অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। একজন তরুণকর্মীর মৃত্যু শুধু তার পরিবারের আয়ই কমায় না, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও হ্রাস করে। হিউম্যান ক্যাপিটাল অ্যাপ্রোচ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির সারাজীবনের সম্ভাব্য আয়ের ভিত্তিতে এই ক্ষতি গণনা করা হয়। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২১, ৮৮০ কোটি টাকা। আহতদের চিকিৎসা একটি বিশাল অর্থনৈতিক ব্যয়। অনেক দরিদ্র পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কেননা নিজেদের সীমিত সম্পদ বিক্রি করে চিকিৎসার খরচ জোগাতে হয়। অনেক সময় বীমা করা থাকলেও, সঠিক সময়ে পাওয়া যায় না। ফলে এর চাপ পরিবারকেই বহন করতে হয়। জরুরি ও পুনর্বাসন সেবার অপ্রতুলতা এই ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে। 

 ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ ২০২০ সালে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় প্রতিদিন যানজটে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি বার্ষিক প্রায় ৩৭,০০০ কোটি টাকা। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রার মান ও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। সড়ক দুর্ঘটনার ফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘক্ষণ যানজটে আটকে থাকার কারণে দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে। এর ফলে মানসিক চাপ বাড়ে, সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং পারিবারিক বন্ধন ভাঙনের আশঙ্কা বেড়ে যায়। এটি সামাজিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, যা অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে।

সড়ক দুর্ঘটনাকে দারিদ্র্যের একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিহত বা পঙ্গু হলে, পরিবারটির স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক পরিবারের শিশুরা লেখাপড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল পড়ে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে। 

দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বেপরোয়া ড্রাইভিং, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা। এ ছাড়া অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, চালকের মাদকাসক্তির প্রবণতাও অন্যতম কারণ। রাস্তায় অনেক পুরনো, ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন দেখা যায়। আবার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের পরিমাণ বেড়েছে। এর ফলেও দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়কে চলাচল করছে বলে ধারণা করা হয় । 

বাংলাদেশ জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা (২০২১-২০৩০)-তে স্বাক্ষর করেছে। এটির লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে সড়কে মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি খুবই ধীর। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও এর প্রয়োগ খুবই দুর্বল। অর্থায়নের অভাব ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় জিডিপির ৩% পর্যন্ত ক্ষতি হয় । বাংলাদেশও এই ধারা থেকে ব্যতিক্রম নয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যদি সড়ক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে বহু প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনা কমানো ও অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করতে হলে শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের সব ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক স্পট চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সংস্কার কাজ শুরু করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকৃত বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও নিহতদের পরিবারের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। হাইওয়েতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত সময়ে আহতদের উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটি সমন্বিত জরুরি সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

 প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। মোটরসাইকেল মূলত তরুণরা বেশি ব্যবহার করে। এজন্য তরুণ ও মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। মোটরসাইকেল চালানোর সময় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গণপরিবহন ব্যবস্থা নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক হওয়া দরকার। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। ফলাফল হিসেবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম ও কর্মক্ষম মানুষদের সড়কে হারানো বন্ধ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা।


সাদেকুর রহমান

গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা