ওআইসি
সাঈদ বারী
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২১ পিএম
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন সংক্ষেপে ওআইসি মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন সংক্ষেপে ওআইসি মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠন। ১৯৬৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি আজ ৫৭টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে বিস্তৃত এক বৈশ্বিক প্লাটফর্ম। এর সদর দপ্তর সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত। প্রতিষ্ঠার পেছনে প্রধান প্রেরণা ছিল মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা এবং বিশেষত ফিলিস্তিন প্রশ্নে সম্মিলিত অবস্থান নিশ্চিত করা।
ওআইসির দাপ্তরিক ভাষা আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি। সংস্থাটির ঘোষিত লক্ষ্য হলো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার, মানবাধিকার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করা। সময়ের বিবর্তনে ওআইসি শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছে।
বর্তমানে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বাংলাদেশ, বেনিন, ব্রুনেই, বুরকিনা ফাসো, ক্যামেরুন, চাদ, কমোরোস, কোট দিভোয়ার, জিবুতি, মিসর, গ্যাবন, গাম্বিয়া, গিনি, গিনি বিসাউ, গায়ানা, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, জর্ডান, কাজাখস্তান, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লেবানন, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মালি, মৌরিতানিয়া, মরক্কো, মোজাম্বিক, নাইজার, নাইজেরিয়া, ওমান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, কাতার, সৌদি আরব, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, সুদান, সুরিনাম, সিরিয়া, তাজিকিস্তান, টোগো, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।
ওআইসির কার্যক্রম মূলত তিনটি স্তরে বিস্তৃত। প্রথমত রাজনৈতিক উদ্যোগ যেখানে ফিলিস্তিন, কাশ্মিরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিবৃতি ও প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। দ্বিতীয়ত অর্থনৈতিক সহযোগিতা যেখানে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা প্রদান করা হয়। তৃতীয়ত মানবিক সহায়তা যেখানে যুদ্ধ ও দুর্যোগে আক্রান্ত মুসলিম জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো এই কার্যক্রমের অনেকটাই সীমাবদ্ধ থেকেছে ঘোষণাপত্র ও সম্মেলনের পরিসরে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংঘাতের সময় ওআইসির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ের ইরান বনাম আমেরিকা-ইসরায়েল উত্তেজনা সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরোধ ও দ্বন্দ্ব চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার, পারমাণবিক কর্মসূচি এই দ্বন্দ্বকে জটিল করেছে। যখন এই উত্তেজনা যুদ্ধের রূপ নেয় বা যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়, তখন মুসলিম বিশ্বের একটি সম্মিলিত অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। সেই জায়গায় ওআইসি কার্যত নিষ্ক্রিয় থেকেছে।
ওআইসি সাধারণত বিবৃতি প্রদান করেছে যেখানে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপ যেমন কূটনৈতিক মধ্যস্থতা, যৌথ শান্তিরক্ষা উদ্যোগ বা কার্যকর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থাটির ভূমিকা ছিল প্রায় অনুপস্থিত। এর অন্যতম কারণ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্যদিকে ইরান তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে ওআইসির ভেতরেই একধরনের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কাজ করে। এই বিভাজন সংস্থাটিকে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া কিছু দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডের (আব্রাহাম অ্যাকর্ড হলো ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং কয়েকটি আরব মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঐতিহাসিক চুক্তি। এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সুদান এবং মরক্কো ইসরায়েলের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে) পর সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে।
ওআইসির সাফল্যের দিক একেবারে নেই তা নয়। সংস্থাটি আন্তর্জাতিক পরিসরে মুসলিম বিশ্বের একটি কণ্ঠস্বর হিসেবে অতীতে কাজ করেছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকটে কূটনৈতিক তৎপরতা এবং কিছু ক্ষেত্রে মানবিক সহায়তা প্রদানে ভূমিকা রেখেছে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নেও সহায়তা দিয়েছে।
কিন্তু ব্যর্থতার তালিকাই দীর্ঘ। সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে না পারা।
ইরান বনাম আমেরিকা-ইসরায়েল উত্তেজনার ক্ষেত্রে ওআইসির ভূমিকা সেই ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। যেখানে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক প্লাটফর্ম হয়ে ওঠার সুযোগ ছিল, সেখানে সংস্থাটি সীমাবদ্ধ থেকেছে বিবৃতির ভেতরে। কোনো কার্যকর মধ্যস্থতার উদ্যোগ বা শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নজির দেখা যায়নি। এখন প্রশ্ন হলো, ওআইসি কি তার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে? এর জন্য প্রথম প্রয়োজন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ও ঐক্য বৃদ্ধি। রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে একটি সাধারণ ন্যূনতম এজেন্ডায় একমত হওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত সংস্থাটিকে শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রোঅ্যাকটিভ ভূমিকা নিতে হবে। সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। তৃতীয়ত ওআইসির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একটি কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, প্রয়োগযোগ্য নীতিমালা এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত- তরুণ প্রজন্ম, নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের সম্পৃক্ত করে সংস্থাটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হবে।
আসলে ওআইসি একটি সম্ভাবনার নাম। মুসলিম বিশ্বের প্রায় দুইশ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী এই সংস্থা যদি তার কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে, তবে তা বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। অন্যথায় এটি কেবল সম্মেলন আর বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যেখানে সংকটের সময়ে প্রত্যাশা থাকবে কিন্তু প্রাপ্তি হবে না।
সাঈদ বারী
প্রকাশক ও কলাম লেখক