× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হামের প্রাদুর্ভাব

অপরাধের সাজা ও টিকা নিশ্চিত হোক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৭ পিএম

অপরাধের সাজা ও টিকা নিশ্চিত হোক

সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক গভীর উদ্বেগের বার্তা বহন করছে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান কেবল চিকিৎসা খাতের সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনছে নাÑ টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা, সচেতনতার ঘাটতি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সমস্যাকেও স্পষ্ট করে তুলছে। রাষ্ট্র ছিল, সরকার ছিল ও জনকল্যাণের বুলি ছিল। কিন্তু গত আট বছর শিশুদেরকে হামের প্রতিষেধক দেওয়া হয়নি। এ অপরাধ অমার্জনীয়।

হামে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আসে। ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রীকে সারা দেশ ঘুরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। হঠাৎ হামের প্রাদুর্ভাবের বর্তমান অবস্থা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে কারণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের নির্দেশও দেন তিনি।

উল্লেখ্য, নির্ধারিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সের আগে শিশুদের হামে আক্রান্ত হওয়ার কথা নয়। কারণ এ সময় পর্যন্ত মাতৃগর্ভ থেকে পাওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতার সুরক্ষায় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এমনকি উদ্বেগজনক হারে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। এই অস্বাভাবিক প্রবণতা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাবিয়ে তুলেছে। জানা গেছে, প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের কভার করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালের পর আর ক্যাম্পেইন হয়নি। ২০১৬ ও ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন করা হয়। কিন্তু করোনা-পরবর্তী বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ক্যাম্পেইন করা সম্ভব হয়নি। এতে টিকার বাইরে একটি বড় অংশ থেকে গেছে, যা এখন সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে। আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালে যে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল, সেই ভ্যাকসিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে রয়েছে। কিন্তু লজিস্টিক এবং ফান্ডিং গ্রাভি এখনও দেয়নি। খুব শিগগিরই এটা প্রয়োগ করা গেলে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

হাম নিয়ে ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেছেন, হাম বর্তমানে শিশুদের মধ্যেই বেশি দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে যারা ছোটবেলায় টিকা নেয়নি তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে কিছু ক্ষেত্রে বড়দের মধ্যেও এ রোগ শনাক্ত হচ্ছে। রোগের শুরুতে সাধারণত জ্বর থাকে ৩-৪ দিন। এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (র‍্যাশ) দেখা দেয়। এর সঙ্গে তীব্র শরীর ব্যথা, বমি ভাব, খেতে না পারাÑ এসব উপসর্গ থাকতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সর্দিকাশি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের সংক্রমণ ঠেকাতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুর জ্বর বা শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি সংক্রমণ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলছেন তারা।

এদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ২৯ মার্চ রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘মিজেলসের (হাম) রোগী অনেক বেড়েছে। দেশে আট বছর আগে মিজেলসের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এরপর কোনো ভ্যাকসিন দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে ভ্যাকসিনের জন্য আমরা ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছি। পারচেজ কমিটি পাস হয়েছে। আমরা ভ্যাকসিন যথাসময়ে কালেকশন করব এবং স্টার্ট করব। আট বছর টিকা দেওয়া হয়নি, এটি কোন সাধারণ তথ্য নয়Ñ জনস্বাস্থ্য ও শিশুদের প্রতি এক গুরুতর অপরাধ। এই শৈথল্য যে মৃত্যু ও ঝুঁকি ডেকে এনেছে তার দায় কে নেবে? এর জন্য দায়ী অপরাধীদের খুঁজে বের করে তাদের সাজা নিশ্চিত করতে হবে।

বলা বাহুল্য, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে। সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু এখনও টিকার আওতার বাইরে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং শহরের বস্তি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো নানা কারণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং মারাত্মক আকার ধারণ করছে। পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে শিথিলতা এবং নজরদারির ঘাটতি।

অতীতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বাংলাদেশের একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের অভাব, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্যদিকে, অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব একটি বড় কারণ। অনেকেই টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে যথাযথ ধারণা রাখেন না। আবার কেউ কেউ ভ্রান্ত তথ্য ও গুজবের প্রভাবে টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপপ্রচারও এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগটি আজ প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

শিশুমৃত্যুর এই করুণ চিত্র আমাদের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং পরিকল্পনার পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে। সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি শিশুর কাছে টিকার নিশ্চয়তা পৌঁছে দিতে হবে এবং এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি, গণসচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। দরকার স্কুল, মসজিদ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। আমরা চাই, একটি হামমুক্ত বাংলাদেশ। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি শিশুর জন্য বাধ্যতামূলক টিকা, জনসচেতনতা ও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তাই এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ জরুরি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা