পর্যবেক্ষণ
ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:৪১ পিএম
আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৮ পিএম
সম্প্রতি রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) দেশে মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের দামে স্বচ্ছতা রাখা, করপোরেট আধিপত্য রোধ, খামারিদের সুরক্ষা ও পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাসহ ছয়টি দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক খামারিদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান, সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, পোল্ট্রি খাদ্য ও ওষুধের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনা প্রদান।
এই সংগঠনের মতে পোল্ট্রি শিল্পে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে মুরগির বাচ্চার দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছিল। যে বাচ্চার স্বাভাবিক দাম ৩০ টাকা হওয়া উচিত, তা কোম্পানিগুলো ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি করছে। ফলে বাজারে মুরগির দাম বাড়লেও প্রান্তিক খামারিরা লাভবান হচ্ছেন না, বরং কোম্পানিগুলো বাজারে মুরগি আসার ৩০ দিন আগেই আগাম মুনাফা নিশ্চিত করছে।
খামারিদের অভিযোগ
দেশের প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিদের দুর্দিন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলেও প্রশাসনের তরফে
কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। জানা গেছে, দীর্ঘদিন যাবত উৎপাদন ব্যয় অপেক্ষা
স্বল্প মূল্যে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা। ডিম প্রতি
উৎপাদনে যেখানে ব্যয় প্রায় সাড়ে ৯ টাকা, সেখানে খামারিদের বিক্রয় করতে হচ্ছে সাড়ে ছয়
টাকায়। এই লোকসান, ঋণের চাপ, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতন- সাকল্যে প্রান্তিক
খামারিদের জীবন এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে। যে কারণে অনেকে খামার গুটিয়ে ফেলছেন, কেউ কেউ
পেশা বদল করছেন; কেউ-বা ঋণের চাপে এলাকাছাড়া। অথচ প্রান্তিক খামারিদের পরিশ্রমের কারণেই
দেশের পোল্ট্রি শিল্প আজ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার খাতে পরিণত হয়েছে। আমরা জানি, আশির
দশক থেকে পোল্ট্রি খাত কৃষির উপখাতরূপে গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান
রাখছে। বাণিজ্যিকভাবে ব্যক্তিগত বিনিয়োগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বড় আকারের খামার
গড়ে উঠেছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর
প্রতিটি ডিমের দর নির্ধারণ করেছে খামার পর্যায়ে ১০.৫৮ টাকা, পাইকারিতে ১১.০১ টাকা ও
খুচরায় ১১.৮৭ টাকা। প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে ১০.১৯ টাকা। অথচ বর্তমানে ঢাকা,
গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকায় খামার পর্যায়ে ডিম বিক্রি হচ্ছে গড়ে ৭.৮৭ টাকা। রাজধানীর
খুচরা বাজারে দাম কিছুটা বেশি হলেও সেটি ৮.৮০ থেকে ৯ টাকার মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে। সে
হিসাবে প্রতিটি ডিম বিক্রি করে খামারির লোকসান হচ্ছে দুই থেকে ২.৩০ টাকা। প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডিমের দৈনিক উৎপাদন সাড়ে পাঁচ কোটি পিস। ফলে এক মাসেই খামারির
লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৪৮ কোটি টাকা। ডিমের মতোই দর পতন হয়েছে
ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাজারে। সরকার নির্ধারিত হিসাবে খামার পর্যায়ে প্রতি কেজি
ব্রয়লারের দর ১৬৮.৯১ টাকা। অথচ বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২২ টাকায়। ফলে প্রতি
কেজিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় ৪৭ টাকা। সোনালি মুরগির ক্ষেত্রেও কেজিতে লোকসান ৫০
টাকার ওপরে। লোকসান সামাল দিতে না পেরে অনেক খামারি নির্ধারিত সময়ের আগেই মুরগি বিক্রি
করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন চক্র ভেঙে পড়ছে। খামার
পর্যায়ে ডিমের দাম সাত টাকা ৫০ পয়সায় নেমে এলেও খুচরা বাজারে একই ডিম বিক্রি হচ্ছে
৯ থেকে ১০ টাকায়। অর্থাৎ এক ডজন ডিমে খামারি যেখানে ২০ থেকে ২৬ টাকা লোকসান গুনছেন,
সেখানে মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিকই ২০ থেকে ২৪ টাকা মুনাফা করছেন। একই চিত্র ব্রয়লার মুরগির
বাজারেও। প্রতি কেজিতে খামারির লোকসান ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা, অথচ মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা
৪০ টাকার বেশি। পরিস্থিতি যাই হোক, লোকসানের বোঝা শুধু খামারির ঘাড়েই পড়ছে।
মাঠ পর্যালোচনায়
দেখা যায় যে, ফেনীর সোনাগাজীর সাতবাড়িয়া গ্রামের এক খামারি বলেন, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে
খরচ পড়ছে প্রায় ৯ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ৭.৫০ টাকায়। প্রতিদিন লোকসান ২২ হাজার
টাকার বেশি। মাস শেষে তা দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা। তিনি বলেন, শীতকালে সাধারণত ডিমের
দাম ভালো থাকে। তবে এ বছর উল্টো। এই ক্ষতি দেখার যেন কেউ নেই। একই উপজেলার সাহেবের
হাট এলাকার আরেক খামারির অভিযোগ, খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ছে, রোগবালাই লেগেই আছে। অথচ
ডিমের দাম উৎপাদন খরচের অনেক নিচে। অনেক খামারি ইতোমধ্যে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। আমরাও
টিকে থাকার লড়াই করছি। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ডিম ও মুরগির দর পতনে পোল্ট্রি খাত
কার্যত বিপর্যস্ত। সেখানকার দুজন খামারি প্রায় এক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সাড়ে ছয় হাজার
লেয়ার মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন। এখন প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হচ্ছে। দুই মাসে লোকসান
দাঁড়িয়েছে অন্তত সাত লাখ টাকা। ডিম ও মুরগির দাম পড়ে যাওয়ায় খামারিরা নিয়মিত ফিড ও
ওষুধ কিনতে পারছেন না। অনেক খামারে খাদ্য সরবরাহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে ফিড ও ওষুধ
ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়ছেন। সরকার ডিমের সর্বোচ্চ খুচরা দর নির্ধারণ করলেও ন্যূনতম মূল্য
নির্ধারণ করেনি। ফলে দাম বাড়লে বাজার তদারকি জোরদার হলেও দর পতনের সময় খামারির পক্ষে
কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। বছরের বড় একটি সময় এই দর পতন চলতেই থাকে, পরে সরবরাহ
সংকটে বাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতি
নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। যেমন- ১. অনেক বেকার যুবক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ
নিয়ে খামার ব্যবসা শুরু করার ফলে পোল্ট্রি খাতের যদ্রূপ দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে ছিল,
তদ্রূপ এই ব্যবসা সফলতায় অনেকেরই ভাগ্য ফিরে ছিল। ২০২০-২১ সালে করোনা মহামারির কারণে
পোল্ট্রি খাত ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়। ওই সময় সরকার কিছু প্রণোদনা দিলেও পোল্ট্রি
খাতের প্রান্তিক খামারিরা তেমন উপকৃত হয়নি। এমনকি বিবিধ জটিলতায় ব্যাংক থেকে অনেক খামারি
যে ঋণ পাননি- সে বিষয়গুলো গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে একাধিকবার উঠে এসেছিল। তারপর পোল্ট্রি
খামারিরা ঘুরে দাঁড়ালেও একাধিকবার নানামুখী সংকটে পড়ে। মুরগি ছানা ও খাবার সিন্ডিকেট
করে উৎপাদক কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি যার অন্যতম।
২. বস্তুত পোল্ট্রি
খাত নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর নীতিমালা নেই। পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা বাস্তবায়িত
হলে এই খাত যদ্রূপ সুরক্ষা পেতে পারে, একইভাবে প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখার কার্যকর
পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হবে।
৩. উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিমের ন্যূনতম
মূল্য নির্ধারণ করা জরুরি।
৪. প্রান্তিক খামারিদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা
করা দরকার।
৫. মুরগির খামারিদের
লাভের গুড় মধ্যস্বত্বভোগীরা যেভাবে খাচ্ছে, সেখানেও দৃষ্টি দিতে হবে।
৬. পোলট্রি খামারিদের
কৃষক কার্ড ও ভর্তুকি প্রদান এবং ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য পৃথক নীতিগত সহায়তা দেওয়া
হলে তারা পুনরায় দাঁড়াতে পারবে। দরিদ্র মানুষের প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখবার
স্বার্থে যতটুকু প্রান্তিক মুরগি খামারিদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে, একইভাবে গ্রামীণ
কর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম হিসাবে এই খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৭. প্রাণিসম্পদ
অধিদপ্তরের তথ্য, দেশে ছোট-বড় পোল্ট্রি খামার প্রায় এক লাখ। এর ১০ শতাংশ বড় খামারি।
সরাসরি ২৫ লাখসহ পরোক্ষভাবে এ শিল্পে শ্রম দিচ্ছেন ৬০ লাখের বেশি মানুষ। দৈনিক চার
থেকে সাড়ে চার কোটি পিস ডিম উৎপাদন হয়। বছরে ১১ লাখ টন মাংস উৎপাদন হচ্ছে। শুধু ডিম-মাংস
উৎপাদন নয়; বাচ্চা, খাদ্য, ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি মিলে এ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি
বিনিয়োগ। তাই এই টাকা ঘরে তুলতে সরকারের নীতি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর
জরুরি।
৮. বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এক মহাপরিচালক বলেছেন, কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের সুফল হলো উৎপাদন খরচ কমছে। কিন্তু খামারিদের এ মুরগি বাজারজাতের স্বাধীনতা নেই। প্রান্তিক খামারিদের রক্ষায় খাদ্য ও বাচ্চার দাম প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে সার্বক্ষণিক মনিটর করতে হবে। বিদ্যুৎ বিল কৃষির হারে নিতে হবে। জটিল রোগের টিকা ও ওষুধ বিনামূল্যে দিতে হবে। আমরা মনে করি, খামারিদের সমিতির আওতায় এনে জামানত ছাড়া ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। প্রতিটি উপজেলার প্রধান বা বড় বাজারে সমিতির নামে দু-তিন শতক জায়গায় মুরগি ও ডিম বিক্রির দোকান নির্মাণ করে দিলে খামারিরা সরাসরি পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ পাবে।
ড. মিহির কুমার রায়
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক