× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশ্ব রাজনীতি

নেতৃত্বের অসঙ্গতি এবং আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি হয়, যা কেবল ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং নেতৃত্বের চরিত্র, কৌশলগত স্থিরতা এবং বাস্তবতার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার গভীর সংকেত বহন করে। সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক বিবৃতি, হুমকি এবং পরস্পরবিরোধী অবস্থান সেই ধরনের এক জটিল ও বিপজ্জনক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে যুদ্ধের ভাষা, কূটনীতির ভাষা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক নাটক একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত।

প্রথমে ঘোষণা এলো ‘রেজিম চেঞ্জ’Ñ একটি বহুল ব্যবহৃত কিন্তু অত্যন্ত বিতর্কিত ধারণা, যা মূলত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোকে বাইরের শক্তির দ্বারা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর পরপরই বলা হলো, শত্রু রাষ্ট্রের সামরিক কাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য কেবল সামরিক সাফল্যের দাবি নয়, বরং প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রচেষ্টা। কিন্তু বাস্তবতা কি এতটা সরল?

পরবর্তী বক্তব্যগুলো এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তোলে। বলা হলো, বিমানবাহিনী ধ্বংস, নৌবাহিনী নিশ্চিহ্ন, প্রথম সারির নেতৃত্ব নিহত, এমনকি দ্বিতীয় সারির নেতারাও আর নেই। অর্থাৎ আলোচনার জন্য কোনো নেতৃত্বই অবশিষ্ট নেই। এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়Ñ যদি সত্যিই আলোচনার জন্য কেউ না থাকে, তবে যুদ্ধের শেষ কোথায়? কাদের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতা হবে? এই প্রশ্নগুলো আন্তর্জাতিক কূটনীতির মূল ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়।

এরপর হঠাৎ করেই ঘোষণা আসেÑ ‘লক্ষ্য প্রায় অর্জিত, আমরা জয়ের দ্বারপ্রান্তে।’ যুদ্ধের ইতিহাসে এমন আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা নতুন নয়, কিন্তু তা যদি পরবর্তী ঘটনাবলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তা কেবল প্রচারণা হিসেবেই বিবেচিত হয়। এবং ঠিক সেটাই ঘটতে দেখা যায়, যখন একই নেতৃত্ব পরক্ষণেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। প্রশ্ন হলোÑ যদি জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো হয়, তাহলে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রয়োজন কেন?

আরও বিস্ময়কর হলো, একই সময়ে মিত্রদের কাছে সাহায্যের আবেদন। একদিকে বলা হচ্ছে, যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন, অন্যদিকে মিত্রদের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। যখন সেই মিত্রদের অনেকেই সাড়া দেয় না, তখন অভিমান প্রকাশ করে বলা হয়, ‘সহায়তা লাগবে না, আমরা একাই পারব।’ এই অবস্থান শুধু কৌশলগত দুর্বলতাই নয়, বরং নেতৃত্বের সিদ্ধান্তগ্রহণের অস্থিরতার প্রতিফলন।

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে, তা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হিসেবে হরমুজ প্রণালী কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এবং পাল্টা হিসেবে তেল স্থাপনায় হামলার সতর্কতাÑ এই ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

কিন্তু এখানেও দেখা যায়, একই ধরনের দ্বৈধ। একদিন বলা হয় প্রণালী অপ্রয়োজনীয়, অন্যদিন সেটিকেই চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আবার বলা হয়, ইরানের জনগণ তাকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেখতে চায়, যা বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য কেবল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে নয়, বরং তা সরাসরি একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ এই পুরো প্রক্রিয়ায় যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী, তা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রথমে রেজিম পরিবর্তন, তারপর সামরিক ধ্বংস, এরপর আত্মসমর্পণ, আবার আলোচনাÑ এই ধারাবাহিকতার মধ্যে কোনো সুসংহত কৌশল বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ছাপ পাওয়া যায় না। বরং এটি একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া-নির্ভর, আবেগপ্রবণ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তগ্রহণের চিত্র তুলে ধরে।

এই অবস্থায় আরব মিত্রদের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু যখন একটি নেতৃত্ব বার বার নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে, তখন সেই নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা একটি মূল উপাদান- যা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসেÑ এই যুদ্ধের শেষ কোথায়? ইতিহাস আমাদের বলে, অধিকাংশ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই গিয়ে শেষ হয়। যতই শক্তি প্রদর্শন করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানই টেকসই হয়। কিন্তু যখন একদিকে বলা হয় আলোচনার জন্য কেউ নেই, অন্যদিকে আবার আলোচনা চলছেÑ তখন সেই প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

এই ধরনের অসঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান কেবল প্রতিপক্ষকে নয়, নিজস্ব মিত্রদেরও বিভ্রান্ত করে। এবং সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের, যারা এই যুদ্ধের সরাসরি বা পরোক্ষ শিকার। অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, নিরাপত্তাহীনতাÑ সবকিছু মিলিয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের বোঝা বহন করতে হয় বিশ্ববাসীকে।

শেষপর্যন্ত বাস্তবতা একটাইÑ যুদ্ধ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বিশেষ করে যখন তার পেছনে সুস্পষ্ট কৌশল, বাস্তবসম্মত লক্ষ্য এবং স্থির নেতৃত্বের অভাব থাকে। বরং এই ধরনের যুদ্ধ আরও সংঘাত, অবিশ্বাস এবং অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি প্রতিফলন, যেখানে কথার চেয়ে কাজ এবং হুমকির চেয়ে কূটনীতিই বেশি প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একতরফা সিদ্ধান্ত, আবেগপ্রবণ বক্তব্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ কেবল একটি অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


হাবিব বাবুল

জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা