মেধাপাচার
প্রদীপ মালাকার
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:২৩ পিএম
প্রতীকী ছবি
যেকোনো দেশের মেধাপাচার একটি নীরব সংকট। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের উন্নয়নের পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত শিক্ষা, ভালো কর্মসংস্থান, উচ্চ বেতন ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী তরুণ-তরুণী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু এই প্রবণতা যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সীমায় থাকে না, বরং জাতীয় উন্নয়নের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মতো
উন্নয়নশীল দেশের জন্য মানব সম্পদই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে
নেওয়ার পরিবর্তে যদি তা বিদেশে চলে যায়, তবে দেশের ভেতরে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি
হয়। চিকিৎসা, প্রকৌশল, গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তিÑ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই আমরা এই
সংকটের প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন কার্যক্রম ধীরগতি হয়ে পড়ে।
একসময়ে আমরা গর্ব করতাম, বাংলাদেশের
মানুষ দেশকে গড়ে তুলতে নিজের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে এগিয়ে আসবে। কিন্তু আজ সেই গর্ব
ধীরে ধীরে ছিটকে যাচ্ছে বিদেশের চাকরি, উচ্চশিক্ষা বা উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষার
চাপে। প্রতিদিনই শত শত তরুণ, দক্ষ পেশাজীবী উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশের সীমানা
পেরিয়ে চলে যাচ্ছেÑ একে আমরা মেধাপাচার বলি। শুধু ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়ন নয়, এটি
একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হাজার হাজার কোটি টাকার
শিক্ষা ও কর্মশক্তি বিনিয়োগ হারিয়ে দিচ্ছে এবং দেশীয় উদ্ভাবন ও উন্নয়নের পথ কমিয়ে
দিচ্ছে।
পাঠ্যবইয়ের ভাষায় মেধাপাচার বলতে বোঝায়
দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও প্রতিভাবান মানুষগুলো যখন গবেষণা, চাকরি বা উন্নত
জীবনের সন্ধানে দেশ ছেড়ে চলে যায়Ñ এতে দেশে মানব সম্পদ হ্রাস পায় এবং সেই
সংস্থানগুলো দেশের উন্নয়নের বদলে অন্য দেশে কাজে লাগতে থাকে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা
অতীতে বহুবার আলোচিত হয়েছে কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পরিসংখ্যান, পরিস্থিতির
গভীরতা স্পষ্ট করে। বিশ্বব্যাংক অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায়
৪.৫ শতাংশ বিদেশে বসবাস করছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ
পেশাজীবী।
এটি শুধুই একটি সংখ্যা নয়Ñ এর সঙ্গে
যুক্ত রয়েছে আরও কিছু বাস্তব উপাত্ত, যা এই সমস্যার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। ২০২৩
সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২ লাখের বেশি দক্ষ কর্মী বিদেশে স্থানান্তরিত
হয়েছে, যা প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
আবার টিবিএ নিউজ জানায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার ১৫৮ জন পেশাজীবী (যেমন
ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ) বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের
তুলনায় অনেক বেশি।
এসব পরিসংখ্যানই বোঝায় যে শুধু শ্রমিকরা
নয়, উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ পেশাজীবীরাও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। একটি গবেষণায় দেখা
গেছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী বাংলাদেশ
ছেড়ে উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশ গেছে।
মেধা পাচারের পেছনে মূল কারণগুলো বোঝা
খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই আছে উন্নত জীবনযাত্রা ও সুযোগের আকর্ষণ। কোনো তরুণ বা
পেশাজীবী যখন দেশে পর্যাপ্ত সুযোগ, উচ্চ বেতন, উন্নত গবেষণার পরিবেশ বা সামাজিক
নিরাপত্তা পায় না, তখন সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশের দিকে
তাকায়। দ্বিতীয় কারণ হলো দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের অভাব। যেখানে
উন্নত দেশগুলো গবেষণা ও প্রযুক্তিতে প্রচুর টাকা ও সুযোগ দেয়, দেশে সেই পরিমাণ
বিনিয়োগ বা সুযোগ নেই। ইউনেস্কো এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার বলেছে যে
বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ থাকলে তরুণ গবেষকরা দেশে
থেকেই কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
মেধাপাচারের প্রভাব দেশের অর্থনৈতিক ও
সামাজিক জীবনের গভীরে। প্রথম প্রভাব হলো মানবসম্পদ ক্ষয়Ñ যেখানে গবেষণা, উদ্ভাবন ও
নতুন প্রযুক্তির বিকাশে দক্ষ মানুষের অভাব দেখা দেয়। এটি শুধু শিক্ষা বা চিকিৎসা
নয়; আইটি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষি, পরিবেশ বিজ্ঞান সব ক্ষেত্রেই দেশের সক্ষমতা কমিয়ে
দেয়।
দ্বিতীয় প্রভাব হলো শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে
বিনিয়োগের অপচয়। প্রতিবছর প্রচুর টাকা খরচ করে সরকার, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান
উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করে, কিন্তু সেই বিনিয়োগের ফল বৃহত্তরভাবে দেশে
ফিরে আসে না। বিশ্বব্যাংক আগেও উল্লেখ করেছে, দক্ষ জনশক্তি বিদেশে চলে যাওয়ার
কারণে দেশের সম্ভাব্য জিডিপি বৃদ্ধির হার প্রায় ০.৫ শতাংশ কমে যেতে পারে, এটা
অর্থনীতির জন্য বড় একটি ক্ষতি। এ অবস্থার সমাধান সহজ নয় কিন্তু অসম্ভবও নয়। প্রথমত,
দেশের গবেষণা ও শিক্ষা খাতে বৃহৎ বিনিয়োগ ও পরিবেশ উন্নয়ন করা দরকার। উন্নত গবেষণা
ল্যাব, স্কলারশিপ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময় সুযোগ দিলে উন্নত
পেশাজীবীরা দেশে থেকেই কাজ করতে অনুপ্রাণিত হবে।
আমি মনে করি,
এই সমস্যার সমাধানে সরকারকে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমেই প্রয়োজন
দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। শিল্পায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং
উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি
খাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নও
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সনদ-নির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত
করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও আধুনিক সুবিধা দিতে
হবে, যাতে মেধাবীরা দেশেই কাজ করার আগ্রহ পায়। এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীদের দেশে
ফিরে আসার জন্য প্রণোদনা ও সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এ ছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির
পরিবর্তনও জরুরি। বিদেশে যাওয়াকে অনেক সময় অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা তরুণদের মধ্যে
এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করে। আমাদের বুঝতে হবে, দেশের ভেতরে থেকেই কাজ করেও সম্মানজনক
জীবন গড়া সম্ভবÑ এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
অনেক উন্নত দেশ ব্রেন সার্কুলেশন নীতি
গ্রহণ করেছে। এতে অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের দেশে ফেরত আসার সুযোগ ও উদ্দীপনা প্রদান করে,
যেমন পরামর্শক, প্রকল্প প্রধান বা গবেষণা ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ দিয়ে। বাংলাদেশও এই
রকম নীতির পরিকল্পনা করলে মেধাবীদের ফেরানো যেতে পারে। যদি আমরা এখনই সঠিক
ব্যবস্থা গ্রহণ করি, তা হলে মেধাপাচার প্রতিরোধ করা সম্ভব এবং মেধাবী তরুণদের দেশে
ধরে রেখে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করা সম্ভব।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, মেধাপাচার রোধ করা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়Ñ এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও সমাজের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের মেধাবীরা যদি দেশের ভেতরেই তাদের প্রতিভা কাজে লাগাতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ আরও দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।
প্রদীপ মালাকার
কলাম লেখক ও নিউইর্য়ক প্রবাসী