জ্বালানি যুদ্ধ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৩:৪৮ পিএম
ইরান-ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে ‘আরেক যুদ্ধ’ শুরু হয়েছেÑ যাকে বলা যায় তীব্র অর্থনৈতিক লড়াই। এমনিতেই বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বিঘ্নিত হলে তার সরাসরি অভিঘাত পড়ে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশের ভেতরেই যেন আরেকটি যুদ্ধ চলছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধের জেরে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর জ্বালানি বাণিজ্য পথটি আংশিকভাবে বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় দেশে দেশে নেওয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। গত কয়েক দিন ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের জন্য পড়েছে দীর্ঘ লাইন। কোথাও কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকরা। বেশিরভাগ পাম্পই বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো পাম্পে টানা দুই সপ্তাহ ধরে পাওয়া যাচ্ছে না অকটেন/পেট্রোল। ফলে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার চালকরা। এমন বাস্তবতায় দেশে জ্বালানি তেল মজুদ প্রতিরোধ, বিপণনে শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতে নজরদারি বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে দেশের ৯ জেলার ১৯ ডিপোতে বর্ডার গার্ড (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি পাচার ঠেকাতে সীমান্তে নিয়মিত টহল অব্যাহত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোল পাম্পগুলো তদারকির জন্য সরকার ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
২৯ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘যুদ্ধে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আরেক যুদ্ধ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ডাল, তেল, চিনি, গমসহ অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় আমদানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসার পর লাইটার জাহাজে খালাস করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নেওয়া হয়। কিছু পণ্য বন্দরের জেটিতে খালাস করে পাঠানো হয় সড়কপথে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রপ্তানি পণ্য পাঠানো হয় বন্দরে। কিন্তু জ্বালানি তেল সংকটে পণ্য পরিবহনের এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় পণ্য খালাসের জন্য লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে যেতে পারছে না। আবার বহির্নোঙরে গেলেও তেল সংকটে পণ্য লোড করে বসে থাকতে হচ্ছে। শুধু পণ্য পরিবহনই নয়, যাত্রী পরিবহনে একই অবস্থা বিরাজ করছে। বাস, হিউম্যান হলারসহ যাত্রী পরিবহনের কাজে নিয়োজিত যানবাহনগুলো চাহিদামতো তেল সরবরাহ পাচ্ছে না।
জানা গেছে, এমন পরিস্থিতির মুখে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও প্রতি মাসে ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে খাতটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে সরকার। এমনকি তেল পাচার রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিরুনি অভিযান পরিচালনা ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডিপো থেকে তেল বিপণনের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তাদের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করা হবে। বিপিসির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের অধীনস্থ তিন বিপণন কোম্পানিÑ পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড এবং যমুনা অয়েল কোম্পানিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ কথা সত্য, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও প্রাকৃতিক গ্যাস ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং সরবরাহ চেইনের বিঘ্নÑ সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে লোডশেডিং, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ভোগান্তি বেড়েছে।
সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জ্বালানির টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। তাই একদিনে স্বল্পমেয়াদি সমাধান, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো এবং বিকল্প উৎস যেমন এলএনজি আমদানির সঠিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ অপচয় রোধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। আমরা মনে করি, দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আমাদের ঝুঁকতে হবে। এক্ষেত্রে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং জলবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন জরুরি। দেশের গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ জ্বালানি সংকট কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবেÑ যাতে আমদানিনির্ভরতা কমে। আঞ্চলিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ করলে সংকট মোকাবিলা সহজ হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দুর্নীতি ও অপচয় রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট এই জ্বালানি সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ জনগণ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই জ্বালানি যুদ্ধ মোকাবিলায় চাই সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর পদক্ষেপ। সহজ করে বললে এই ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’ জয় করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।