× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সরকার ও দলের পৃথক সত্তা

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১৩:০৭ পিএম

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মহিউদ্দিন খান মোহন, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আমাদের দেশের রাজনীতির একটি বিশেষ ধরন হলো, একটি রাজনৈতিক দল সরকারে গেলে এর পৃথক সত্তা আর অবশিষ্ট থাকে না। দলটি সরকারের ভেতরে এক প্রকার বিলীন হয়ে যায়। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করা তখন কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ রাজনৈতিক দল ও সরকার পৃথক সত্তার দুটি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান। যদিও সরকার গঠিত হয় রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে, তবে সরকার ও দল স্বতন্ত্র অবস্থানে থাকবে, এটাই কাম্য। কিন্তু আমাদের দেশে এ নিয়মটি মানা হয় হয় না, হয়নি। দেখা গেছে, যখন একটি রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করে, তখন সে দলটির উঁচু থেকে নিচু পর্যন্ত সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিজেদেরকে সরকার ভাবতে শুরু করে। তারা সরকারি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে এমনভাবে নাক গলাতে বা প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, যার ফলে সরকারি প্রশাসন ঠিকভাবে তার কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে পারে না। এতে দুটি ক্ষতি হয়। এক. সরকারি কাজে দলীয় কর্মীদের হস্তক্ষেপের ফলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। দুই. দলের নেতাকর্মীরা সরকারি কাজে ব্যস্ত হওয়ার ফলে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়; যা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে দুর্বল করে। এজন্যই রাজনীতির বিশেষজ্ঞগণ বলে থাকেন, দল ক্ষমতায় গেলে নেতৃত্বের কঠোর দৃষ্টি রাখা আবশ্যক দলÑ যাতে কোনোভাবেই সরকারের ভেতরে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ তারা দলকে সরকার থেকে আলাদা রাখার পরামর্শই দিয়েছেন।

ক্ষমতাসীন হওয়ার পর একটি রাজনৈতিক দলের সরকারের মধ্যে লীন হয়ে যাওয়ার উদাহরণের অভাব অন্তত আমাদের দেশে নেই। স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা এ প্রবণতাটি দেখে আসছি। প্রবণতা না বলে কুপ্রবণতা বলাই বোধকরি শ্রেয়। কেননা, এটি একটি খারাপ প্রবণতা এবং তা রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর। কেননা, এর ফলে দল সরকার চালাবে, না সরকার দল চালাবে তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ক্ষমতাসীন হওয়া আওয়ামী লীগকে আমরা দেখেছি ‘সরকারি দলে’ পরিণত হতে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ তখন তার স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা হারিয়ে সরকারি তকমা আঁটা দলে পরিণত হয়েছিল। দলটির নেতাকর্মীরা তাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের দ্বারা বুঝিয়ে দিত, তারা সরকারেরই অংশ। তাদের কথা ছাড়া সরকারি কোনো কাজ সম্পন্ন হতো না। তারা যে কাজে বাধা দিত, সরকারি কোনো কর্মকর্তার সাহস কিংবা ক্ষমতা ছিল না, তা করার দুঃসাহস দেখায়। ফলে সাধারণ মানুষ ধন্দে পড়ে যেত সরকারি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে। স্বাধীনতার পরপর চালু হওয়া সে কুপ্রবণতাটি পঞ্চান্ন বছর পরেও এতটুকু কমেনি। বরং ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেড়েছে। 

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই দলীয় পরিচিতি অর্জনের এই অসৎ প্রবণতার প্রধান কারণ সুবিধা আদায়।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ক্ষমতাসীন সরকার ও দলের মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বিগত লীগ-জমানায়। ২০০৯ সালে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সরকারের বাইরে আরেকটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কেবিনেটের একটি আকার ছিল এবং সময়ে সময়ে তার পরিবর্তনও ঘটত। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে অলিখিত সরকার কায়েম করেছিল, তার কোনো আকার-আকৃতি ছিল না। আকার-আকৃতিহীন এই সরকারের সদস্যরা মূল রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনভাবে ক্ষমতার প্রভাব খাটাত যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ছিল অসহায়। তারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারত না, বা সাহস পেত না। ফলে মুখ গুঁজে কাজ করা ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর ছিল না। অবশ্য রাষ্ট্র তথা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এ সুযোগে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়ার মওকা হাতছাড়া করেনি। তারা সরকারের বাইরের এ ক্ষমতাধরদের হুকুম তামিল করে নিজেরাও লাভবান হয়েছে। আর সেজন্যই কখনও কখনও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চেয়ে সরকারি অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অতিশয় ‘লীগপ্রেমিক’ হিসেবে নিজেদের প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। আমলা-কর্মচারীদের মধ্যে কে কত বড় লীগ সমর্থক কিংবা মুজিবভক্ত তা প্রমাণের জন্য রীতিমতো ম্যারাথন দৌড় চলত। 

প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই দলীয় পরিচিতি অর্জনের এই অসৎ প্রবণতার প্রধান কারণ সুবিধা আদায়। যেহেতু এ দৃষ্টান্ত অতীতেও রয়েছে যে, সরকারি চাকরি করেও দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ দিতে পারলে নিজের আসন পোক্ত হয় এবং ওপরে ওঠার সিঁড়ি হয় মসৃণ, তাই তারা নিজেদের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর চেয়ে দলীয় কর্মীর পরিচয়ে পরিচিত করতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। আর সে কারণেই সচিবালয় থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তর, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-বীমা, কল-কারখানায় দলীয় সংগঠনের ছড়াছড়ি। রাষ্ট্রীয় ওইসব দপ্তরে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ ‘জননেত্রী পরিষদ’, ‘আমরা কামাল জামাল রাসেলের ভাই’, ‘জিয়া পরিষদ’, ‘দেশনেত্রী পরিষদ’ ইত্যাদি নামের সংগঠনের শাখার আধিক্যই বলে দেয়, প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক দলবাজি কতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে! আর এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে মূলত সরকারি প্রশাসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রভুত্বের কারণে।

দীর্ঘদিনের চলমান এই অশুভ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে, নাকি এর রাশ টেনে ধরা হবে, এ প্রশ্ন সচেতন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেননা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত যেসব ঘটনা সারা দেশে ঘটেছে, তাতে এ সন্দেহ পাকাপোক্ত হয়েছে যে, হয়তো পুরনো সে ট্র্যাডিশন আাগামীতেও বজায় থাকবে। বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়েছে এক মাস পার হয়েছে ইতোমধ্যে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এ সরকারের শুরুটা বেশ ভালোই হয়েছে। ‘মর্নিং সোজ দ্য ডে’ বলে যে প্রবচনটি ইংরেজিতে চালু আছে, সে হিসেবে বলা যায়, শুরুর এ শুভ উদ্যোগগুলো বহাল রাখা সম্ভব হলে এ দেশের রাজনীতি ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক না হলেও ইতিবাচক একটি পরিবর্তন আশা করা যায়। বিশেষত ক্ষমতাসীন দল বিএনপির কর্মীদের যদি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব হতে পারে। রাজনীতি কলুষিত হয় এর শীর্ষ নেতৃত্বের দুর্বলতা, অপরিণামদর্শিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিচ্যুতির কারণে। শীর্ষ নেতৃত্ব যখন আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে রাজনীতি এবং রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যবহার-অপব্যবহার করেন, তখন এর রেশ নিম্ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অনেকটা সাগরে জোয়ার এলে যেমন পানির প্রবাহ খাল-বিল, নদী-নালা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে তেমনই। 

প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনে বসার পর তারেক রহমান এ পর্যন্ত যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন বা যে পরিকল্পনার কথা বলেছেন, তাতে তার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ মেলে। যদি সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করা, হেঁটে সচিবালয় থেকে অন্যত্র যাওয়া, অনেকটা নিরাপত্তাহীনভাবে পথচলা নিয়ে সচেতন মানুষদের আপত্তি রয়েছে। কেননা, যেকোনো দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়, তাহলোÑ ‘সেফটি ফার্স্ট’। অর্থাৎ নিরাপত্তা প্রথম। বিষয়টি প্রধানও বটে। নিশ্চয়ই তিনি এগুলো বিবেচনায় নেবেন। 

সরকারে আসার পর বিএনপির একশ্রেণির নেতাকর্মীর মধ্যে সে অশুভ প্রবণতাটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছিল, যেটি অতীতেও অন্যান্য দলের ক্ষেত্রে ঘটেছে। যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনা ঘটেছে। আগেই বলেছি, একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিজেদের সরকারের অংশ বলে মনে করে। তারা সরকারি প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে খবরদারি করতে শুরু করে। এর ফলে যে পাবলিক নুইসেন্স সৃষ্টি হয়, তাতে সরকারের যেমন জনপ্রিয়তা কমে, তেমনি শাসক দলেরও ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। সম্ভবত এ সত্যটি উপলব্ধি করতে পেরেই বিএনপির হাইকমান্ড নতুন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা দল ও সরকারের পৃথক সত্তা রক্ষা করে সরকারি কর্মকাণ্ড ও দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতাকে সাবলীলভাবে পরিচালনা করতে চাচ্ছে। গত ২৮ মার্চ একটি দৈনিকের বিশেষ প্রতিবেদনে সে কথাই তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকাটি বিএনপি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, বিএনপি জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা সরকারের প্রক্রিয়া থেকে দলের প্রক্রিয়া আলাদা রাখতে চায়, যাতে দলীয় কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে না আসে। এজন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা নিয়োগ পেয়েছেন, তাদেরকে দলের দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। 

সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। তবে তা করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। কেননা, দলকে সরকার থেকে আলাদা রাখতে গিয়ে এমন কিছু করা যাবে না, যা সরকার এবং দল দুটোকেই দুর্বল করে দেয়। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বিষয়টি প্রধান বিবেচনায় রাখা জরুরি। অভিজ্ঞদের যেমন সরকারেও প্রয়োজন, তেমনি দলেও তাদের প্রয়োজন। বৃক্ষকে সতেজ করার জন্য অনেক সময় এর ডালপালা ছেঁটে ফেলার প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে এমনভাবে ছেঁটে ফেলা যাবে না, যে কারণে সালোকসংশ্লেষণে বৃক্ষের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বিএনপি যদি সরকার ও দলকে পৃথক রেখে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা যেমন তাদের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে, তেমনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাডিশনে নতুনত্ব সংযোজন করবে। 


মহিউদ্দিন খান মোহন

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা