× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু…’

আবু জুবায়ের

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬ ১২:১৮ পিএম

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যখন আদর্শের চেয়ে স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন প্রতীকী ক্লান্তি যেন বিষণ্ন চাদরের মতো পুরো সমাজকেই গ্রাস করে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যখন আদর্শের চেয়ে স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন প্রতীকী ক্লান্তি যেন বিষণ্ন চাদরের মতো পুরো সমাজকেই গ্রাস করে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু, পথে যদি পিছিয়ে পড়ি কভু...’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতালি’ কাব্যগ্রন্থের এই আধ্যাত্মিক পঙ্‌ক্তিটি আদতে ছিল স্রষ্টার কাছে মানুষের নিজস্ব দীনতা, অক্ষমতা ও ক্লান্তির বিনম্র স্বীকারোক্তি। কিন্তু বাংলা ভাষার এই কালজয়ী লাইনটিকে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্যানভাসে অনন্য, তীক্ষ্ণ ও প্রতীকী মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট, প্রয়াত আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। কোনো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যখন চরম পচন, নীতিহীনতা, অবিবেচনা আর ঘোর অমানিশা পরিলক্ষিত হয়, তখন একজন দেশপ্রেমিক ও বিবেকবান নাগরিকের রাষ্ট্রিক হতাশা ও যন্ত্রণার মহাকাব্যিক দীর্ঘশ্বাস হয়ে ওঠে এই পঙ্‌ক্তিটি। তিনি এই পঙ্‌ক্তিটি ব্যবহার করে মুজিব আমলে একটা লেখা লিখে বিলেত চলে যান। 

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যখন আদর্শের চেয়ে স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন এই প্রতীকী ক্লান্তি যেন বিষণ্ন চাদরের মতো পুরো সমাজকেই গ্রাস করে। পৃথিবীর যেকোনো রাজনৈতিক ভূগোলেই যখন ‘রাজনৈতিক অবিবেচনা’ এবং ‘নেতৃত্বের বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা’ প্রকট আকার ধারণ করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাজনীতির প্রতি গভীর বীতশ্রদ্ধা ও বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়। রাজনীতি তখন আর জনকল্যাণের হাতিয়ার থাকে না, পরিণত হয় কেবলই ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকার অন্ধ প্রতিযোগিতায়।

রাজনীতি বিজ্ঞানে এবং বিশ্ব ইতিহাসে নির্মম সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছেÑ ক্ষমতার নিজস্ব জাদুকরী অন্ধত্ব আছে। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অবিবেচনা বা ট্র্যাজেডির জন্ম হয় ঠিক তখনই, যখন ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মহল প্রজ্ঞার পথ হারিয়ে ফেলে এবং নিজেদের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী ও দুঃসময়ের পরীক্ষিত সহযোদ্ধাদের চিনতে ভুল করে। ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায়, যেকোনো শক্তিশালী সাম্রাজ্য বা শাসকগোষ্ঠীর পতনের প্রথম ও প্রধান অশনিসংকেত হলো এই ‘আপন মানুষ চিনতে না পারার ব্যর্থতা’। চতুর্দশ শতাব্দীর বিখ্যাত আরব সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তার কালজয়ী ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের যে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেখানে তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন রাষ্ট্র বা শাসনব্যবস্থা তখনই পতনের দিকে ধাবিত হয়, যখন শাসক তার পুরনো, বিশ্বস্ত ও ত্যাগী সঙ্গীদের (‘আসাবিয়াহ’ বা সামাজিক সংহতি) দূরে ঠেলে দেয় এবং নতুন, সুবিধাবাদী চাটুকারদের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।

সিংহাসনের চারপাশে যখন চাটুকার, মোসাহেব আর স্তাবকগোষ্ঠীর এক দুর্ভেদ্য বলয় গড়ে ওঠে, তখন প্রকৃত সত্য শাসকের কান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। ইতালীয় রেনেসাঁর প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলি তার ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে শাসকদের সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘চাটুকাররা হলো রাজদরবারের প্লেগ রোগের মতো। একজন বুদ্ধিমান শাসকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো স্তাবকদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করা।’ কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ক্ষমতার দম্ভে শাসকরা এই স্তুতিবাক্যেই সবচেয়ে বেশি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এর ফলে যারা নিঃস্বার্থভাবে দল বা আদর্শের জন্য রক্ত-ঘাম এক করেছেন, যারা দুঃসময়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, ক্ষমতার সুসময়ে তারাই হয়ে পড়েন উপেক্ষিত, ব্রাত্য এবং কখনও কখনও ‘শত্রু’।

এই যে বুদ্ধিবৃত্তিক শুভাকাঙ্ক্ষীদের অবমূল্যায়ন করে হাইব্রিড ও নব্য-সুবিধাবাদীদের হাতে নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তুলে দেওয়া এটি কেবল একটি ভুল সিদ্ধান্ত নয়, চরম ‘রাজনৈতিক অবিবেচনা’। শাসনব্যবস্থা যখন এই অবিবেচনার ফাঁদে পা দেয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে ব্যর্থ হয়। রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লবের পূর্ববর্তী রাজতন্ত্র ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, স্তাবকরা কখনওই দুঃসময়ে পাশে থাকে না। ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার সামান্যতম আভাস পেলেই এই সুবিধাবাদীরা সবার আগে নৌকার তলা ছিদ্র করে পালিয়ে যায়। তখন পতনোন্মুখ ব্যবস্থার পাশে দাঁড়ানোর মতো সেই ‘নিজের মানুষগুলো’ আর অবশিষ্ট থাকে না, কারণ দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অভিমানে তারা আগেই যোজন যোজন দূরে ছিটকে পড়েন।

ব্রিটিশ লর্ড অ্যাক্টনের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘ক্ষমতা মানুষকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, আর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মানুষকে নিরঙ্কুশভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত করে।’ এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় প্রকাশ কেবল অর্থলুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ও আদর্শিক বিচ্যুতি রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। যখন কোনো সমাজে সত্য বলার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, যখন গঠনমূলক সমালোচনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তখন সেই রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই ঘুণপোকা বাসা বাঁধে।

আজকের পৃথিবীর অনেক রাজনৈতিক দৃশ্যপটেই এই চরম অবিবেচনার উদাহরণ দৃশ্যমান। একদিকে ক্ষমতার বলয়ে থাকা মহল নিজেদের ভেতরেই সত্যিকারের মিত্র চিনতে ব্যর্থ হয়ে একচেটিয়া আধিপত্যের মোহে অন্ধ হয়ে থাকে, অন্যদিকে বিরোধীরাও অনেক সময় আদর্শিক রাজনীতির পরিবর্তে সাময়িক সুবিধার গোলকধাঁধায় পথ হারিয়ে ফেলে। এই উভয় সংকটে পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষ এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।

দমবন্ধ করা রাজনৈতিক আবহে দাঁড়িয়েও সেই একই প্রতিধ্বনি শোনা যায় ‘প্রভু, এই দীনতা, এই ক্লান্তি ক্ষমা করো।’ এই ক্লান্তি ব্যক্তিগত নয়, এই ক্লান্তি একটি সামষ্টিক চেতনার। যে সমাজ দীর্ঘ সংগ্রামের পরও একটি সুস্থ, সহনশীল এবং আদর্শিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে নাÑ এ ক্লান্তি তাদের সবার।

যেকোনো শাসকগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সময় থাকতে তাদের এই ‘রাজনৈতিক অবিবেচনা’ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, যদি তারা স্তাবকদের ভিড় ঠেলে নিজেদের প্রকৃত মানুষদের চিনতে ও মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে কালের অমোঘ নিয়মে এক চরম ও অনতিক্রম্য পরিণতি অপেক্ষা করে। কারণ, যারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, ইতিহাস কখনোই তাদের ক্ষমা করে না। পথে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি, এই পিছিয়ে পড়া আর কত দীর্ঘ হবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ভর করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুভবুদ্ধি ও প্রজ্ঞার জাগরণের ওপর।


আবু জুবায়ের 

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কবি

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা