পরিবেশ
ড. মো. শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ১২:৫৫ পিএম
বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় মাটির অম্লতা ও উর্বরতা ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক, যা সরাসরি ফসল উৎপাদন, পুষ্টি গ্রহণ এবং কৃষকের আয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। দেশের বিভিন্ন Agro-ecological অঞ্চলে, বিশেষ করেÑ মধুপুর গড়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং উপকূলীয় কিছু অঞ্চলে অম্ল মাটির (Acid Sulphate Soil) উল্লেখযোগ্য বিস্তৃতি লক্ষ করা যায়।
এসব অঞ্চলের মাটির গঠন, বৃষ্টিপাতের ধরন, ভূমির উচ্চতা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ভিন্নতার কারণে অম্লতা সৃষ্টি ও বিস্তার লাভ করে। অম্ল মাটি বলতে, সাধারণত সেই মাটিকে বোঝায় যার অম্লমান (pH) ৬.৫-এর নিচে থাকে এবং অধিক অম্লীয় অবস্থায় এটি ৫.৫-এর নিচে নেমে যায়। এ ধরনের মাটিতে প্রয়োজনীয় উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অ্যালুমিনিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের মতো ক্ষতিকর উপাদানের দ্রাব্যতা বেড়ে গিয়ে ফসলের জন্য বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে। ফলে শিকড়ের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এই কারণে অম্ল মাটির সঠিক শনাক্তকরণ, নিয়মিত মাটি পরীক্ষা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি, যাতে টেকসই কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।
অম্ল মাটির উৎপত্তি ও বিস্তার
বাংলাদেশে অম্ল মাটির সৃষ্টি প্রধানত
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণেই ঘটে। প্রাকৃতিকভাবে অধিক বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির
ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি ক্ষারীয় উপাদান ধুয়ে নিচে নেমে যায় এবং মাটিতে
হাইড্রোজেন (H⁺) ও অ্যালুমিনিয়াম (Al³⁺) আয়নের আধিক্য বৃদ্ধি পায়। এর ফলে মাটির
অম্লতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এছাড়া অ্যামোনিয়াম-ভিত্তিক
সার, যেমনÑ ইউরিয়া, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মাটির অম্লতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে,
যখন তা সুষম সার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয় না। ১০০ কেজি ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট
অম্লতা নিরপেক্ষ করতে প্রায় ৮০-৮৫ কেজি ক্যালসিয়াম কার্বোনেট (চুন) প্রয়োজন হয়।
যদি Dolomite {CaMg(CO₃)₂} ব্যবহার করা হয়, তবে Mg সরবরাহের অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়া
যায়। মাঠ পর্যায়ে সঠিক মাত্রা নির্ধারণের জন্য মাটি পরীক্ষা করা সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।
দেশের পুরাতন প্লাবনভূমি ও পাহাড়ি
অঞ্চলে অম্লমান ৪.৫-৫.৫-এর নিচে পর্যন্ত নেমে যেতে দেখা যায়, যা অধিকাংশ ফসল উৎপাদনের
জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং ফলন কমিয়ে দেয়।
অম্ল মাটির সমস্যা
অম্ল মাটিতে ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে
বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয় :
১. পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি :
ফসফরাস, মলিবডেনাম ইত্যাদির প্রাপ্যতা কমে যায়। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত
হয় এবং ফলন কমে যায়।
২. বিষাক্ততার সমস্যা :
অ্যালুমিনিয়াম ও ম্যাঙ্গানিজের দ্রাব্যতা বৃদ্ধি পেয়ে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা
শিকড়ের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৩. মাইক্রোবিয়াল কার্যকলাপ
হ্রাস : উপকারী ব্যাকটেরিয়া
ও অণুজীবের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে জৈব পদার্থের পচন ও পুষ্টি উপাদানের মুক্তি ব্যাহত
হয়।
৪. মাটির গঠন দুর্বলতা
: মাটির কাঠামো ভেঙে পড়ে। ফলে
পানি ও বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং শেকড়ের বিস্তার সীমিত হয়।
এমন মাটিতে সার ব্যবহারের দক্ষতা
উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং সামগ্রিকভাবে ফসলের ফলন কমে যায়, যা কৃষকের উৎপাদন
ব্যয় বৃদ্ধি ও লাভ কমিয়ে দেয়।
অম্ল মাটির ব্যবস্থাপনা কৌশল
বাংলাদেশে অম্ল মাটির কার্যকর ব্যবস্থাপনার
জন্য সমন্বিত পদ্ধতি (Integrated Approach) গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১। চুন প্রয়োগ: অম্ল মাটির সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা হলো চুন
প্রয়োগ। চুন (CaCO₃, CaMgCO3) মাটির অম্লতা কমিয়ে pH বৃদ্ধি করে । চুন
প্রয়োগের ফলে অ্যালুমিনিয়াম বিষক্রিয়া কমে। নাইট্রোজেন স্থিরকারী ব্যাকটেরিয়ার
কার্যকারিতা বাড়ে ও মাটির গঠন উন্নত
হয়।
বাংলাদেশে এখনও চুন প্রয়োগ ব্যাপকভাবে
প্রচলিত হয়নি। তবে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এবং চা-বাগানে এর ব্যবহার দেখা যায় । ইদানীং
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের পুরাতন হিমালয় পাদদেশীয় সমভূমি, বরেন্দ্র ভূমি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের
মাটি পরীক্ষায় দেখা গেছে অম্লমান ৩.৫-৪.০-এর নিচে নেমে এসেছে, যা ফসল ফলনের জন্য খুবই
উদ্বেগজনক।
প্রস্তাবনা :
১. মাটির পরীক্ষা অনুযায়ী চুনের
পরিমাণ নির্ধারণ করা।
২. প্রতি ২-৩ বছর পর পর মাটি পরীক্ষা
করা ।
৩. চুনের প্রয়োগমাত্রা অম্লতার
তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ২-২.৫ টন হবে।
জৈব পদার্থের ব্যবহার
জৈব সার (মুরগির সার, গোবর, কম্পোস্ট,
ভারমি-কম্পোস্ট, সবুজ সার) অম্ল মাটির উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১. মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পেলে
অম্লতার ক্ষতিকর প্রভাব কমে।
২. পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা বাড়ে।
৩. মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি
পায়।
সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনা
(INM)
রাসায়নিক সার, জৈব সার এবং জৈব
প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার অম্ল মাটির জন্য খুবই কার্যকর।
১. সুষম সার ব্যবহারে পুষ্টির ঘাটতি
দূর হয়।
২. ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ।
৩. মাটির স্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদে
উন্নত হয়।
উপযোগী ফসল ও জাত নির্বাচন
:
অম্ল মাটিতে সহনশীল ফসল ও উপযোগী জাত নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিক ফসল
নির্বাচন করলে প্রতিকূল পরিবেশেও তুলনামূলক ভালো উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। উদাহরণ : ধান, আনারস, চা, কাসাভা এবং কিছু ডাল
ও ফলজাত ফসল।
বাংলাদেশে বিশেষ করে, ধান চাষ অম্ল
মাটিতে তুলনামূলকভাবে ভালো ফলন দেয়, কারণ ধান কিছুটা অম্লীয় পরিবেশ সহ্য করতে পারে।
এ ছাড়া উপযুক্ত সহনশীল জাত নির্বাচন করলে উৎপাদন আরও স্থিতিশীল ও লাভজনক করা সম্ভব।
সঠিক সার ব্যবস্থাপনা
অম্ল মাটিতে সার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ : ফসফরাস সার ব্যান্ড পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা। নাইট্রোজেন সার ভাগে ভাগে
প্রয়োগ করা ও অতিরিক্ত অ্যামোনিয়াম সার ব্যবহার কমানো।
গবেষণায়
দেখা গেছে, চুন সাধারণত রবি মৌসুমে ফসল বপন বা রোপণের ১৫-২০ দিন আগে জমিতে প্রয়োগ
করে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। মাটি শুষ্ক থাকলে হালকা সেচ দেওয়া
উচিত। এতে মাটির অম্লতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়।
৬। পানি ব্যবস্থাপনা: বিশেষ করে, উপকূলীয় অম্ল সালফেট মাটিতে পানি
ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত শুকিয়ে গেলে মাটিতে পিরাইট অক্সিডেশন
হয়ে তীব্র অম্লতা সৃষ্টি করে । তাই পানি ধরে রাখা বা নিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশন
প্রয়োজন।
ফসল আবর্তন ও বহুমুখীকরণ
ফসল আবর্তন (crop rotation) অম্ল
মাটির উন্নতিতে সহায়ক। ডালজাতীয় ফসল অন্তর্ভুক্ত করলে নাইট্রোজেন যোগ হয়। মাটির
জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায় । রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে।
আধুনিক
প্রযুক্তির ব্যবহার
অম্ল
মাটির ব্যবস্থাপনায় কিছু আধুনিক ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে: মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট
ব্যবস্থাপনা, ন্যানো সার প্রযুক্তি ও প্রিসিশন এগ্রিকালচার। এসব প্রযুক্তি
উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, সারের অপচয় কমায় এবং অম্ল
মাটির বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা হ্রাস করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
নীতিগত দিক ও করণীয়
বাংলাদেশে অম্ল মাটির টেকসই ব্যবস্থাপনার
জন্য কিছু নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন : কৃষকদের জন্য মাটি পরীক্ষার সুবিধা সম্প্রসারণ,
চুন ও জৈব সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা ও অম্ল
মাটি উপযোগী ফসল ও জাত উদ্ভাবন।
বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অম্ল মাটির সঠিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। অম্লতা মাটির পুষ্টি প্রাপ্যতা, গঠন এবং জীববৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করে। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যায়। তবে চুন প্রয়োগ, জৈব পদার্থ সংযোজন, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, উপযোগী ফসল নির্বাচন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহার করলে এই সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব। তাই ‘বেশি সার ব্যবহার’ নয়, বরং ‘সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন’Ñ এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে অম্ল মাটির ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
ড. মো. শহিদুল ইসলাম
মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ও প্রাক্তন মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)