প্রতিভা থেকে নেতৃত্ব
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
বাংলাদেশ আজ এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে- উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জ্ঞানভিত্তিক ও নেতৃত্বসমৃদ্ধ জাতি গঠনের চ্যালেঞ্জ সামনে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দেশের মেধাবী তরুণদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা, লালন করা এবং জাতীয় নেতৃত্বের ধারায় সম্পৃক্ত করা। এ প্রেক্ষাপটে একটি সুসংগঠিত, রাষ্ট্র-সমর্থিত ‘জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি’ অবিলম্বে পুনরায় চালু করা সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে
এমন একটি উজ্জ্বল উদ্যোগের দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের
দূরদর্শী নেতৃত্বে ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজভ্রমণের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মাননা
ও প্রণোদনার যে অনন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সেই কর্মসূচি
শুধু মেধাবীদের স্বীকৃতি দেয়নি, বরং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের বীজ
রোপণ করেছিল। আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক কাঠামোয় পুনর্জীবিত
করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
প্রস্তাবিত এই
জাতীয় ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচির অধীনে প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রতিটি
শিক্ষা বোর্ডে শীর্ষস্থান অর্জনকারী ২০ জন শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা যেতে পারে। দেশের
বিভিন্ন অঞ্চল, সংস্কৃতি ও সামাজিক পটভূমি থেকে উঠে আসা এই শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে
একটি জাতীয় প্লাটফর্মে নিয়ে আসা হলে তারা পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের
দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করতে পারবে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে গড়ে উঠবে একটি শক্তিশালী
নেটওয়ার্ক- যা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এই কর্মসূচির
অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে দুই দিনের একটি বিশেষ শিক্ষা ও অনুপ্রেরণামূলক জাহাজভ্রমণ,
যা সুন্দরবনের মতো বিশ্বখ্যাত প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের মাঝে আয়োজন করা যেতে পারে। সুন্দরবন
শুধু একটি পর্যটন স্থান নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের
একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ভ্রমণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু
পরিবর্তনের প্রভাব এবং টেকসই উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা লাভ করবে।
বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জিত এই জ্ঞান তাদের ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে
ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভ্রমণকালীন সময়ে
বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা, নেতৃত্ব উন্নয়ন সেশন এবং জাতীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়ের
সুযোগ রাখা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞানই নয়, বাস্তব জীবনের
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলও শিখতে পারবে। পাশাপাশি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দলগত কার্যক্রম
এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বিষয়ক আলোচনা তাদের মধ্যে সমন্বয়, সহমর্মিতা ও নেতৃত্বের
গুণাবলি বিকাশে সহায়ক হবে।
এই কর্মসূচির
একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে জাতীয় নেতৃত্বের সরাসরি সম্পৃক্ততা। যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান এই উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি
সময় ব্যয় করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে তরুণদের জন্য এক বিরাট অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য, তিনি যদি কোনো একসময় জোহর বা আসরের নামাজে ইমামতি করেন, তবে তা শিক্ষার্থীদের
মাঝে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের এক গভীর বার্তা পৌঁছে দেবে।
এমন প্রতীকী উদ্যোগ জাতীয় জীবনে মূল্যবোধভিত্তিক নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে
প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অর্জনের জন্য কেবল পরীক্ষার ফলাফলই যথেষ্ট নয়। একটি কার্যকর
জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি নানা গুণাবলির সমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে। তাই
প্রয়োজন সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা।
এতে করে আমাদের তরুণ প্রজন্ম শুধু একাডেমিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং
তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
এই কর্মসূচি দেশের
প্রতিটি অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করবে, যা
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদার করবে। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি
করবে, পাশাপাশি সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে তুলবে।
অতএব, এখনই সময়
এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার। অতীতের সফল অভিজ্ঞতা,
বর্তমানের চাহিদা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে একত্রিত করে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক
ও টেকসই জাতীয় ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি চালু করা গেলে তা বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে
এক নতুন যুগের সূচনা করবে। জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই বিনিয়োগই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে
শক্তিশালী ভিত্তি।
ড. মোহাম্মদ ফয়েজ উদ্দিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান, নিউ হোপ গ্লোবাল, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য