ইরান যুদ্ধের ধাক্কা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৫:৩৩ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমেরিকান ডলারের দাম আবারও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ধাক্কা বা চাপ সৃষ্টি করেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের দাম আবারও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ধাক্কা বা চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রিজার্ভের ওপর চাপ এবং টাকার মান হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে ডলারের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। ফলে বিশ্বব্যাপী ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ইতিহাস বলছে, যখনই এই অঞ্চলে সংঘাত তীব্র হয়েছে, তখনই বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে গেছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
২৭ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশে ‘ইরান যুদ্ধের ধাক্কা ডলারের গায়ে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই তথ্যটি উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার বাজারে কয়েক দিন ধরেই ডলারের দাম বাড়ছে। সেই ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। অর্থাৎ লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলার আগের শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এদিকে ইয়েনের বিপরীতে ডলারের মান প্রায় অপরিবর্তিত আছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৫৯ দশমিক ৪১ ইয়েন পাওয়া যাচ্ছে। অস্ট্রেলীয় ডলারের মান শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমে শূন্য দশমিক ৬৯৪৩ ডলারে নেমেছে। নিউজিল্যান্ডের ডলার শূন্য দশমিক ৫৮০৬ ডলারে স্থির আছে। সামগ্রিকভাবে মার্চ মাসে ডলার ইনডেক্সের মান প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। অক্টোবরের পর এটাই ডলার ইনডেক্সের মাসিক সর্বোচ্চ বৃদ্ধি।
তবে অফশোর লেনদেনে চীনের ইউয়ানের বিপরীতে ডলার প্রায় অপরিবর্তিত আছে। এখন প্রতি ডলারে ৬ দশমিক ৯০২৬ ইউয়ান পাওয়া যাচ্ছে। ইউরোর মান ১ দশমিক ১৫৬০ ডলারে স্থির আছে। প্রতি ১ ব্রিটিশ পাউন্ডের বিপরীতে এখন ১ দশমিক ৩৩৬৫ ডলার পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশে স্থির আছে। পাউন্ডের ওপর চাপ পুরোপুরি কাটেনি। অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে বিটকয়েনের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ৭১ হাজার ২৪৭ ডলারে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে তেলের দাম বাড়তি, অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাধান দেখা যাচ্ছে নাÑ এই পরিস্থিতিতে ডলারের পালে যে হাওয়া লেগেছে। তাদের ধারণা, যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত না থাকলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন আশা করা যায় না।
এ কথা সত্য যে, বিশ্ববাজারে ডলারকে দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপদ মুদ্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংকট বা অনিশ্চয়তার সময় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ইরানকে কেন্দ্র করে সেই প্রবণতাই আবারও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ডলারের মান শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে, জ্বালানি বাজারে এর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব-জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, যার প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনেÑ পণ্যের দাম বাড়ে, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়।
ডলারের এই শক্তিশালী অবস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য দ্বিগুণ চাপ তৈরি করে। একদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের পরিশোধও কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ঋণের বড় অংশই ডলারে নির্ধারিত। ফলে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে সেই ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। আমাদের অর্থনীতিও এই বৈশ্বিক অস্থিরতার বাইরে নয়। ডলার শক্তিশালী হলে টাকার ওপর চাপ পড়ে, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে ওঠে এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি অনুভূত হয়। এতে করে বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দূরদর্শী নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির দিকে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করার বিষয়টিও। মনে রাখা দরকার, ইরানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ডলারের শক্তিশালী অবস্থান সেই প্রভাবকে আরও তীব্র করে তুলবে। তাই সতর্কতা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর পদক্ষেপই হতে পারে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার একমাত্র উপায়।