× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

বজ্রপাতের ঝুঁকি এবং বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

রাহমান তৈয়ব

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:৪৫ পিএম

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৫ পিএম

বাংলাদেশে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা দেয়। গ্রামাঞ্চলে হাওর ও মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ প্রায়ই এই দুর্যোগের শিকার হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা এটিকে জননিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত করেছে। প্রকৃতির এই শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ঘটনাটির পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ। তাই বজ্রপাতের প্রকৃতি বোঝা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

আরো পড়ুন: শৈলকুপায় বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু, আহত ৪

বজ্রপাত মূলত মেঘের মধ্যে সৃষ্ট বৈদ্যুতিক শক্তির হঠাৎ নির্গমনের ফল। যখন আকাশে বড় আকারের বজ্রমেঘ বা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়, তখন সেই মেঘের ভেতরে বরফকণা, জলকণা ও বায়ুর ঘর্ষণের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জ সৃষ্টি হয়। মেঘের ওপরের অংশে সাধারণত ধনাত্মক চার্জ এবং নিচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ জমা হয়। যখন এই চার্জের পার্থক্য অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তখন মেঘের মধ্যে কিংবা মেঘ ও ভূমির মধ্যে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ নির্গত হয়। এই শক্তিশালী বিদ্যুৎ নির্গমনই হলো বজ্রপাত। বজ্রপাতের সময় তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, যা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি। এই তীব্র তাপের কারণে চারপাশের বাতাস দ্রুত প্রসারিত হয়ে যে শব্দ সৃষ্টি করে, সেটিই বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে বজ্রপাতের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। গ্রীষ্ম ও বর্ষার সন্ধিক্ষণে যখন উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত ওপরের দিকে উঠে ঠান্ডা বায়ুর সঙ্গে সংঘর্ষ করে, তখন বজ্রমেঘ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তা ছাড়া উন্মুক্ত মাঠ ও জলাশয় ও বজ্রপাতের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকে।

বাংলাদেশে বজ্রপাতের কারণে মৃতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গত এক দশকে হাজার হাজার মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ীÑ ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে প্রায় ৩,৮৪৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত ৩,৪৮৫ জন মারা গেছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়। বজ্রপাতে মারা যাওয়া বছরভিত্তিক কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান হলোÑ ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩০৭ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ১৯৮ জন, ২০২০ সালে ২৫৫ জন, ২০২১ সালে ৩১৪ জন, ২০২২ সালে ৩৪৬ জন, ২০২৩ সালে প্রায় ৩৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে এক দিনে বজ্রপাতে প্রায় ৮০ জনের মৃত্যু হওয়ার ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপরই সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বজ্রপাতে নিহতের প্রায় ৯০ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের মানুষ এবং তাদের বড় অংশ কৃষিকাজের সময় মাঠে থাকে। 

বাংলাদেশের কিছু অঞ্চল বজ্রপাতের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের হাওর এলাকা, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ এবং উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলা বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া এপ্রিল ও মে মাসে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এই সময় কৃষকরা মাঠে কাজ করেন এবং ঝড়বৃষ্টির কারণে খোলা জায়গায় আটকে পড়ে। এতে প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়ে।

বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কিছু সাধারণ সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে এবং বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। পাকা ঘর বা বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা আছেÑ এমন ভবনে আশ্রয় নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। দ্বিতীয়ত, খোলা মাঠ, নদী, পুকুর, উঁচু গাছ কিংবা বৈদ্যুতিক খুঁটির নিচে অবস্থান করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক সময় মানুষ বৃষ্টির সময় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়, কিন্তু বজ্রপাতের সময় এটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে। তৃতীয়ত, বজ্রপাতের সময় ধাতব বস্তু, মোবাইল ফোন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার কমানো উচিত। খোলা জায়গায় আটকে পড়লে মাটিতে শুয়ে পড়ার পরিবর্তে দুই পা কাছাকাছি রেখে নিচু হয়ে বসে থাকা তুলনামূলক নিরাপদ। চতুর্থত, কৃষক ও জেলেদের জন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক মোবাইলে বার্তা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

বজ্রপাত মোকাবিলায় সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং কিছু এলাকায় তালগাছ রোপণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা জরুরি। প্রথমত, গ্রামাঞ্চলে বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা প্রয়োজন। স্কুল, কলেজ, মসজিদ, বাজার ও খোলা মাঠে এসব যন্ত্র স্থাপন করলে প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করা দরকার। যদি বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ থেকে ৩০ মিনিট আগে জানানো যায়, তবে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবে এবং অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। তৃতীয়ত, স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে বজ্রপাত সম্পর্কে মৌলিক বিজ্ঞান ও নিরাপত্তা নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতা প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন। চতুর্থত, গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কর্মসূচি চালু করলে মানুষ দ্রুত ঝুঁকি বুঝতে পারবে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে পারবে।

বজ্রপাত প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক ঘটনা হলেও এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিবছর শত শত মানুষ বজ্রপাতে প্রাণ হারাচ্ছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মানবিক ও সামাজিক সমস্যা। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সরকারের কার্যকর পরিকল্পনার সমন্বয়েই এই দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। সময়মতো সতর্কতা, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং জনগণের সচেতন আচরণ বজ্রপাতের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে।


রাহমান তৈয়ব 

শিক্ষক, সুনামগঞ্জ, সিলেট


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা