× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

স্বাধীনতার ৫৫ বছর : স্মৃতি, অর্জন ও আত্ম-অনুভূতি

আসাদুজ্জামান খান মুকুল

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৫ পিএম

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। একটি বিভীষিকাময় রাত। ইতিহাসের পাতায় একে আমরা ‘কালোরাত’ বলি। কিন্তু যারা সেই রাতটি পার করেছিলেন, তাদের কাছে এটি কেবল ইতিহাসের কোনো পরিভাষা ছিল না। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। একটি বিভীষিকাময় রাত। ইতিহাসের পাতায় একে আমরা ‘কালোরাত’ বলি। কিন্তু যারা সেই রাতটি পার করেছিলেন, তাদের কাছে এটি কেবল ইতিহাসের কোনো পরিভাষা ছিল না। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

আটটার সংবাদের আগে বিটিভির সেই সুর- ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না...’। সুরটা কানে গেলেই বুকের ভেতর কেমন জানি একটা শিহরণ খেলা করত। তখন তো আর স্যাটেলাইট টিভির এই ঝকঝকে দুনিয়া ছিল না। এন্টেনা ঘুরিয়ে ঝিরঝিরে পর্দায় সেই গানটি যখন বাজত, তখন শৈশবের সেই অপরিপক্ব মনেও একটা ঘোর তৈরি হতো। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার করে সেই সুরটা যখন আবার মনে পড়ে, তখন কেবল জানালার গ্রিল নয়, যেন স্মৃতির আগলগুলোও হুড়মুড় করে খুলে যায়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। একটি বিভীষিকাময় রাত। ইতিহাসের পাতায় একে আমরা ‘কালোরাত’ বলি। কিন্তু যারা সেই রাতটি পার করেছিলেন, তাদের কাছে এটি কেবল ইতিহাসের কোনো পরিভাষা ছিল না। এটি ছিল দানবের সাথে পাঞ্জা লড়া। একটি ভূখণ্ড যখন স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, ঠিক সেই মুহূর্তেই নেমে এসেছিল নরক। পঁচিশের সেই রাতটি ছিল নিস্তব্ধতার বুক চিরে আসা বুলেটের শব্দ। আগুনের লেলিহান শিখা। মানুষের আর্তচিৎকার।

সেই রাতে কী ঘটেছিল, তা আমরা ইতিহাসের পাতা থেকে জানি। বড়দের মুখে গল্প শুনে জেনেছি। কিন্তু সেই অনুভবের তীব্রতা কি আজও আমাদের নাড়া দেয়? ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে যখন স্বাধীনতার ঘোষণা এলো, তখন চারদিকে কেবল লাশ আর ধ্বংসস্তূপ। এক দিকে বুকফাটা কান্না, অন্যদিকে নতুন সূর্যের প্রতীক্ষা। ভয় আর স্বপ্ন কীভাবে একই আকাশের নিচে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে ছিল, তা ভাবলে আজও গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যায়। এক দিকে প্রিয়জনকে হারানোর ভয়, অন্য দিকে শৃঙ্খল ভাঙার অদম্য প্রতিজ্ঞা। এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই তৈরি হয়েছিল আমাদের এই বাংলাদেশ।

আজ ৫৫ বছর পর আমাদের সেই বোধের জানালাগুলো কি আসলে খোলা আছে? আমরা কি বুঝতে পারছি, এই যে আজ আমরা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, এর প্রতিটি কণা কতখানি রক্ত দিয়ে কেনা? স্বাধীনতা মানে তো কেবল একটি মানচিত্র নয়। স্বাধীনতা মানে কেবল একটি পতাকা নয়। এটি একটি চেতনা। একটি নিরন্তর বয়ে চলা নদী।

আমার ভাবনায় একাত্তর মানে কেবল যুদ্ধের ময়দান নয়। একাত্তর মানে সেই মা, যিনি তার সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দরজায় খিল না দিয়ে সারা রাত জেগে থাকতেন। একাত্তর মানে সেই কিশোর, যে নিজের শৈশবকে বিসর্জন দিয়ে হাতে তুলে নিয়েছিল ভারী রাইফেল। তাদের ত্যাগ আর তিতিক্ষার গভীরতা পরিমাপ করার মতো কোনো দাঁড়িপাল্লা আজও তৈরি হয়নি। আমরা যখন আজ উন্নয়নের গল্প বলি, যখন আকাশছোঁয়া অট্টালিকার দিকে তাকাই, তখন কি একবারও মনে পড়ে সেই মাটিচাপা পড়া হাড়গুলোর কথা? যারা কোনোকিছুর বিনিময় ছাড়াই আমাদের এই দেশটা উপহার দিয়ে গেছেন?

কিন্তু আজ যখন চারপাশে তাকাই, তখন এক গভীর বিষাদ বুক চেপে ধরে। যে সাম্য আর ন্যায়বিচারের স্বপ্নে একাত্তরে মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, তা কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি? আজ স্বাধীন বাংলাদেশে দুর্নীতির মহোৎসব চলে। সাধারণ মানুষের হক কেড়ে নিয়ে একদল মানুষ নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। টেন্ডারবাজি আর চাঁদাবাজি আজ এক ভয়ংকর ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলে পেশিশক্তির দাপট। সাধারণের জমি দখল করে গড়ে ওঠে প্রভাবশালীদের প্রাসাদ। এই দৃশ্যগুলো কি একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধারা কল্পনা করেছিলেন?

শৃঙ্খল ভেঙে আমরা যে দেশ চেয়েছিলাম, সেখানে সন্ত্রাসীর হুংকার থাকার কথা ছিল না। সেখানে মানুষ শান্তিতে ঘুমানোর নিশ্চয়তা চেয়েছিল। অথচ আজ তুচ্ছ কারণে হানাহানি আর রক্তপাতে রাজপথ রঞ্জিত হয়। ক্ষমতার লোভে নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে প্রতিদিন। আমাদের প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা অনেকটা অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে। আমরা ধরেই নিয়েছি, এটা আমাদের পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে রক্ষা করা অনেক বেশি কঠিন। আজকের এই অস্থির সময়ে, বিভেদের এই রাজনীতিতে আমাদের সেই আদি চেতনায় ফিরে যাওয়া খুব জরুরি। সেই চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িকতার। সেই চেতনা ছিল সাম্যের। সেই চেতনা ছিল শোষিত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর।

বিটিভির সেই গানের কথায় বলা হয়েছিলÑ ‘ওরা আসবে চুপি চুপি, যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’। প্রশ্ন হলো, তারা কি সত্যিই আমাদের হৃদয়ে ফিরে আসে? নাকি আমরা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় তাদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি? ২৬ মার্চ এলে আমরা ফুল দেই, গান গাই। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে আমাদের সেই বোধের জানালাগুলো কেন বন্ধ থাকে? কেন আমরা দুর্নীতির কাছে মাথা নত করি? কেন আমরা অন্যের মতকে সম্মান জানাতে দ্বিধাবোধ করি?

আমাদের মুক্তি অর্জিত হয়েছে অনেক আগে। কিন্তু আমাদের মানসিক মুক্তি কি আজও পুরোপুরি এসেছে? ১৯৭১ ছিল একটি মাইলফলক। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। কেবল অবকাঠামোয় উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন নৈতিকতার উন্নয়ন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ আর সন্ত্রাসহীন পরিবেশই হতে পারে শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান। একটি সমৃদ্ধ, সুন্দর আর মানবিক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

আসুন, আমরা কেবল ইতিহাসের পাঠক না হয়ে ইতিহাসের ধারক হই। আমাদের প্রতিটি কাজের মধ্যে যেন ফুটে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের সেই মূল সুর। রক্ত দিয়ে কেনা এই মাটিকে আমরা যেন আর কোনো কলঙ্কে বিদ্ধ না করি। স্বাধীনতা কেবল একটি দিন নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের প্রতিটি মুহূর্তের এক গভীর অনুভব।


আসাদুজ্জামান খান মুকুল

সাভার, নান্দাইল, ময়মনসিংহ

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা