ইমেইল থেকে
সংগীত কুমার
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:২৪ পিএম
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপি মিডিয়া সেল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। কোনো সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য এক মাস খুবই অপ্রতুল সময়। সরকারের কর্মকাণ্ড বুঝে উঠতেই এক মাসের বেশি সময় লেগে যায়। তার ওপর একটি সরকারের বিদায়ের পর আরেকটি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের যে পরিপ্রেক্ষিত, এ সরকারের ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ভিন্ন। এ সরকার এসেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে। তাই সরকারকে মূল্যায়নের জন্য এক মাস যথেষ্ট সময় নয়। তবু এই সময়টিই বলে দেয়, সরকার কোন পথে হাঁটতে চায় এবং রাষ্ট্রকে কোন মানসিকতায় পরিচালনা করতে চায়।
আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকার তার দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। যেমনÑ ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফের মতো প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ। অর্থাৎ, সরকার তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তৎপর, যা দেশবাসীর মধ্যে একধরনের আশার সঞ্চার করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান পদেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঘোষিত নামগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষক-সংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতা।
দেশে ১১টি সিটি করপোরেশনসহ ৪২টি জেলা পরিষদে রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান সরকার। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কেউ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছিলেন, আবার কেউ দলটির মনোনয়ন বঞ্চিত ছিলেন। কিন্তু বিএনপি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ তাই প্রশাসক নিয়োগ নয়, স্থানীয় সরকারে দ্রুত নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়াটা সরকারের করণীয় হওয়া উচিত।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি ছিল তা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। দায়িত্ব গ্রহণের পর নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা, সীতাকুণ্ডে শিশুধর্ষণ ও হত্যা, হবিগঞ্জে চা-বাগানে নারী ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী হত্যা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ বিভাগে শিক্ষিকা হত্যা, পাবনায় ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ইত্যাদি প্রমাণ করে সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তেমন সফল হতে পারেনি।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। যার প্রভাব এসে পড়েছে দেশের বাজারেও, মধ্যেপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দেশে তেল সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ তেল পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়েকটি পাম্প চালু আছে সেগুলোতে তেলের জন্য দীর্ঘ লাইন এবং তেল নেওয়ার সময় মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটছে। খুচরা বাজারে তেলের দাম ৩০০ টাকা পর্যন্ত উঠে গেছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সরকারের জন্য অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সামগ্রিকভাবে, সরকার এমন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে ছিল। তার ওপর বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় সরকারকে একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তার পরেও এক মাসে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে বলা যায় শুরুটা মন্দ নয়।
সংগীত কুমার
শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়