ইমেইল থেকে
সংগ্রাম দত্ত
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো একদিনে রচিত হয়নি; এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও আন্দোলনের ফসল। প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো একদিনে রচিত হয়নি; এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও আন্দোলনের ফসল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানÑ সবকিছুর ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি অর্জন করে স্বাধীনতা। এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মতো মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলও রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অথচ এই অঞ্চলের বহু সংগ্রামী মানুষ এখনও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বাইরে রয়ে গেছেন, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও আলোচনা চলছে।
শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামের রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থেকে দৈনিক সংবাদসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখির মাধ্যমে স্বাধীনতার চেতনা, গণমানুষের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে জনমত গড়ে তুলেছেন। ষাটের দশক থেকেই তিনি একজন সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল শ্রীমঙ্গলে দায়ের হওয়া ‘জয় বাংলা’ মামলা স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাকিস্তান সরকার স্বাধীনতা আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে। তাদের মধ্যে ছিলেন ন্যাপ নেতা রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, ছাত্রলীগ নেতা এম এ রহিম এবং এস এ মুজিব।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী শ্রীমঙ্গলে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। পরে তিনি ভারতে গিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্যাম্পে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখান থেকে স্বাধীনতার পক্ষে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। তবে বিস্ময়কর হলেও সত্যÑ এতসব অবদান থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনও রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।
ন্যাপ নেতা মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে সক্রিয় ছিলেন। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেন। এম এ রহিম ১৯৬৮ সালে শ্রীমঙ্গল থানায় ছাত্রলীগের থানা কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্থানীয় ছাত্ররাজনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করে। তার জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় তিনি ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে পর পর দুইবার পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ছাত্রনেতা এস এ মুজিব মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরবর্তী সময়েও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই তিনজন নেতাই জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শ্রীমঙ্গলের মানবিক সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডেও অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাবেক পৌর কমিশনার শহিদুল আলম স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন এবং মানুষকে সংগঠিত করেন। সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. রইস মিয়া (ময়না মিয়া) স্থানীয় মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে একত্রিত করেন। একই সময়ে কমলেশ ভট্টাচার্য সংগ্রাম পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি পৌর চেয়ারম্যান হন এবং দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করতে নিজের সম্পত্তি পর্যন্ত বিক্রি করেন, যা আজও আত্মত্যাগের এক বিরল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরী এখনও স্বীকৃতির জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপিল করেন। তার বড় ছেলে ২০২৪ সালের ১৯ মে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে অগ্রগতি না হওয়ায় বিষয়টি হাইকোর্টে রিট আকারে বিচারাধীন রয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের অনেক সংগ্রামী ব্যক্তি সময়মতো আবেদন করতে পারেননি, আবার কেউ আবেদন করেও তথ্যের অভাবে বাদ পড়েছেন। ফলে তাদের অবদান ইতিহাসের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, এসব সংগ্রামী মানুষের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি। কারণ, এই ইতিহাস শুধু অতীত নয়Ñ এটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।
সংগ্রাম দত্ত
কলাম লেখক, সিলেট