ইমেইল থেকে
মোজাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১৩:১৯ পিএম
অনেকে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর জন্য শহরে চলে যায়। কেউ রিকশা চালায়, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, কেউ রাস্তার কাজে যুক্ত হয়, কেউ বিভিন্ন কোম্পানিতে ডে-লেবারের কর্মী হিসেবে যুক্ত হয়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিতে গ্রামের কৃষকদের অবদান অনেক। কেননা গ্রামের সবাই কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তারা তাদের পরিশ্রমের যথাযথ ফলাফল পায় না। ফসল তোলার পর বিক্রির উপযুক্ত করলেই দেখা যায় বাজার সিন্ডিকেট। উৎপাদিত পণ্যের দাম অনেক কম। লাভ তো হয় না, বরং লোকসান। ফলে দেখা যায়Ñ কৃষকরা যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ফসল ফলিয়েছে, সেই পরিমাণ অর্থই ঘরে আনতে ব্যর্থ। দিনশেষে দোকানের সার, কীটনাশক বা ওষুধের টাকায় পরিশোধ করতে পারে না। পরিবার চালানো তো অনেক দূরের কথা। এভাবে বরাবরই কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে যায়।
তাই অনেকে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর জন্য শহরে চলে যায়। কেউ রিকশা চালায়, কেউ গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে কাজ করে, কেউ রাস্তার কাজে যুক্ত হয়, কেউ বিভিন্ন কোম্পানিতে ডে-লেবারের কর্মী হিসেবে যুক্ত হয়। যে যেখানে পারে যুক্ত হয়। কিন্তু সারা দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করে যে বেতন পায় তা দিয়েই সংসার চালানোই কষ্টকর। ভাগ্য বদলানো অনেক দূরের বিষয়।
গ্রামের এই সহজ-সরল মানুষরা সকল ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়। আইন, বিচারসহ অন্য সকল ক্ষেত্রে। বলা হয়ে থাকে আইনের চোখে সবাই সমান। কিন্তু বাস্তবতায় আইনের চোখে অর্থের প্রাধান্য, আইনের চোখে ক্ষমতার প্রাধান্য। গ্রামে কোনো মেয়ে ধর্ষিত হলে দেখা যায় গ্রামের পাতিনেতারা অর্থের ভিত্তিতে সমাধান করে। পত্রিকায় এমন খবর অনেক পাওয়া যায়। আবার ভুক্তভোগী আইনের দ্বারস্থ হলে আসামি পক্ষ অর্থের বিনিময়ে, ক্ষমতার দাপটে সবকিছু যেখানে ছিল, সেখানেই শেষ করে দেয়। সঠিক বিচার আর পাওয়া হয় না। এটা শুধুমাত্র একটা উদাহরণ। এরকম হাজারো বৈষম্যের শিকার হয় এই সহজ সরল মানুষরা। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আদৌও কি এর শেষ হবে বাংলাদেশে?
মানুষের মৌলিক অধিকারÑ যেগুলো না হলেই নয়। জীবন বেঁচে থাকার জন্য যা অত্যাবশ্যক। যেমনÑ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও চিত্তবিনোদন। কিন্তু গ্রামের মানুষের এসব মৌলিক অধিকার সরকার কতটুকু নিশ্চিত করতে পারছে? এখানও মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, একবার খেতে পারলে আরেকবার খেতে পারে না। বাজার সিন্ডিকেট আরেক বড় সমস্যা। বিশেষ করে, যারা দিন এনে দিন খায় তাদের জন্য। অনেকে রুটি খেয়েও দিনাতিপাত করা লাগে দিনের পর দিন। নুন আনতে পান্তা ফুরায়, যার বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় গ্রামে। সুষম খাদ্য তো অনেক দূরের বিষয়। ভুগতে হয় অপুষ্টিতে।
রয়েছে বাসস্থানের সমস্যা। অনেকের ঘরবাড়ি নেই, ভিটে জমি নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভাসমান মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১১৯ জন। এ তালিকায় আছে, যাদের বসবাসের ঘরবাড়ি নেই। যারা রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, মাজার, ফুটপাত, সিঁড়ি, ওভারব্রিজের নিচে, লঞ্চ টার্মিনাল, ফেরিঘাট, মার্কেটের বারান্দায় দিনাতিপাত করে। আর বস্তিতে বসবাস করছেন ১৮ লাখ ৪৮৬ জন। নির্বাচন এলে ভোটের জন্য প্রার্থীরা নানা ধরনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে তাদের ভাগ্য বদলানোর আশ্বাস দিয়ে যায়; দেখা যায় কেউ কৃষকের ধান কেটে দেয়, মাটি কেটে দেয়। যে ব্যক্তি যে কাজ করে, তাকে সেই কাজেই সাহায্য করে। হতে চায় মাটি ও মানুষের জননেতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, ভোট শেষ হলে নির্বাচিত প্রার্থী তথা জননেতাকে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না।
সরকারি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের অনুদান দেওয়া হয়। বিভিন্ন ধরনের কার্ড বা ভাতা দেওয়া হয়। যেমনÑ বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে খাদ্য-সহায়তা এবং অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এসব ভাতার অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশের বেশি মানুষকে টাকা দিয়ে এসব ভাতা নিতে হয়। আবার অনেক সময় যথাযথ ব্যক্তিরাও পায় না। অথচ এসবের লক্ষ্য গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করা। কিন্তু লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ পায় তা দেখার দায় কার। আমরা চাই, দেশের সকল নাগরিক মিলে গড়ে তুলি একটি সুন্দর হবে সমাজ, একটি সুন্দর বাংলাদেশ।
মোজাহিদ হোসেন
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া