জিয়াউর রহমান
আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬ ১১:৪৮ এএম
জিয়াউর রহমানের জীবন শুরু হয়েছিল সামরিক শৃঙ্খলার কঠোর পরিবেশে, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক গভীর দেশপ্রেমের বীজ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহিরুহে পরিণত হয়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যেন এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়Ñ রক্ত, বেদনা, বীরত্ব আর অদম্য সাহসের এক মহাকাব্য। এই ইতিহাসে প্রতিটি নাম, প্রতিটি ঘটনা একেকটি জ্বলন্ত শিখার মতো, যা আলোকিত করে জাতির আত্মপরিচয়। সেই শিখাগুলোর মধ্যে একটি উজ্জ্বল, দৃপ্ত ও অনন্য নাম হলো জিয়াউর রহমানÑ যিনি শুধু একজন সৈনিক নন, বরং সংকটের অন্ধকারে দিকনির্দেশনা দেওয়া এক সাহসী কণ্ঠ, রণাঙ্গনের অজেয় বীরযোদ্ধা।
জিয়াউর রহমানের জীবন শুরু হয়েছিল সামরিক শৃঙ্খলার কঠোর পরিবেশে, কিন্তু তার ভেতরে ছিল এক গভীর দেশপ্রেমের বীজ, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহিরুহে পরিণত হয়। পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই তরুণ অফিসার ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছিলেন তার পেশাদারত্ব, সাহস এবং কৌশলগত প্রজ্ঞা। যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তাকে শুধু অস্ত্র চালানো শেখায়নি; শিখিয়েছিল কীভাবে সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, আর কীভাবে নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং ইতিহাসনির্ধারক পরীক্ষা আসে ১৯৭১ সালে। একদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে তার দায়িত্ব, অন্যদিকে নিজের জাতির আর্তনাদÑ এই দ্বন্দ্বের মুহূর্তে তিনি বেছে নেন সত্যের পথ, ন্যায়ের পথ, নিজের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চÑ বাংলার ইতিহাসের এক কালরাত। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঢাকার আকাশে জ্বলতে থাকে আগুনের লেলিহান শিখা, রাস্তায় বইতে থাকে রক্তের স্রোত, চারদিকে শুধু আর্তনাদ, আতঙ্ক আর মৃত্যুর বিভীষিকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ঘরÑ কোথাও নিরাপত্তা নেই। সেই রাত কেবল একটি সামরিক অভিযান ছিল না; বরং এটি ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব মুছে ফেলার নির্মম প্রচেষ্টা।
এই অমানবিক বর্বরতার ঘন অন্ধকার ভেদ করেই জন্ম নেয় প্রতিরোধের প্রথম শপথ। ২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাত যেন পুরো জাতিকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তোলে। আর তার পরদিন, ২৬ মার্চÑ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস পরিণত হয় জাগরণের দিনে, প্রতিবাদের দিনে, ঘুরে দাঁড়ানোর দিনে।
এই দিনেই বাঙালি জাতি স্পষ্ট করে বুঝে যায়Ñ এ লড়াই আর কেবল রাজনীতি নয়; এটি নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই, নিজের মাটি ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার লড়াই। ভয়কে পেছনে ফেলে, অনিশ্চয়তাকে অগ্রাহ্য করে, মানুষ তখন সিদ্ধান্ত নেয়Ñ এবার প্রতিরোধই একমাত্র পথ, সংগ্রামই একমাত্র উত্তর।
এই প্রেক্ষাপটে তদানীন্তন পাকিস্তানের ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমানের ভূমিকা হয়ে ওঠে ঐতিহাসিকভাবে অনন্য। তিনি বিদ্রোহ করে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার ঘোষণা যেন বজ্রের মতো আঘাত হানে। সেই কণ্ঠে ছিল না দ্বিধা, ছিল না ভয়Ñ ছিল দৃঢ়তা, সাহস এবং অটল বিশ্বাস। তার সেই ঘোষণা শুধু একটি বার্তা ছিল না; বরং এটি ছিল একটি জাতির আত্মপ্রকাশ, অস্তিত্ব রক্ষার অঙ্গীকার, সশস্ত্র প্রতিরোধের এক স্পষ্ট আহ্বান।
যখন চারদিকে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক বিরাজ করছিল, তখন তার কণ্ঠ হয়ে ওঠে পথের দিশা। গ্রাম থেকে শহর, জনপদ থেকে জনপদে ছড়িয়ে পড়ে সেই আহ্বান। মানুষ বুঝতে পারেÑ এবার আর পিছু হটার সুযোগ নেই। একজন সৈনিকের কণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক বাঙালিকে দেয় নতুন সাহস, নতুন শক্তি, নতুন আত্মবিশ্বাস।
তবে তার ভূমিকা কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনে। একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় ‘জেড ফোর্স’, যা হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী। সীমিত অস্ত্র, সীমাহীন সংকট, তবুও অদম্য মনোবলÑ এই নিয়েই তিনি নেতৃত্ব দেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার মানুষ। দূর থেকে নির্দেশ নয়Ñ সৈনিকদের পাশে দাঁড়িয়ে, একই ঝুঁকি নিয়ে, একই বিপদের মুখোমুখি হয়ে তিনি লড়েছেন। তার উপস্থিতি সৈনিকদের মনে জাগিয়েছে সাহস, তার কণ্ঠ দিয়েছে দৃঢ়তা, তার নেতৃত্ব দিয়েছে বিজয়ের বিশ্বাস।
প্রতিটি অভিযানে ছিল মৃত্যুর সম্ভাবনা, প্রতিটি মুহূর্তে ছিল অনিশ্চয়তা। কিন্তু তিনি থামেননি, পিছু হটেননি। তার চোখে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্নÑ একটি মুক্ত দেশের স্বপ্ন, একটি সম্মানের জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে, আর সেই স্বপ্নই লাখ লাখ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
এই বীরত্ব, এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত হন। তবে তার প্রকৃত স্বীকৃতি কোনো পদক বা উপাধিতে সীমাবদ্ধ নয়; তা লুকিয়ে আছে মানুষের হৃদয়ে, জাতির কৃতজ্ঞতায়, ইতিহাসের অমলিন পাতায়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো যে স্বাধীনতার ঘোষণাকে ঘিরে একটি কুচক্রী মহল বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা করে। কিন্তু স্বাধীনতায় বিশ্বাসী প্রতিটি মানুষ বিশ্বাস করেন যে সংকটের সেই বিভ্রান্তিকর মুহূর্তে জিয়াউর রহমান একটি কার্যকর, সাহসী এবং ইতিহাস-নির্ধারণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাঙালি দীর্ঘদিন ধরে লালন করছিল, সেই স্বপ্নকে রণাঙ্গনের বাস্তবতায় রূপ দিতে যে কণ্ঠগুলো সামনে এগিয়ে এসেছিল, জিয়াউর রহমান ছিলেন তাদের অগ্রভাগে।
সর্বোপরি এটাও স্বীকার করতে হবে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তির কীর্তি নয়; এটি একটি সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফল। লাখো মানুষের রক্ত, অসংখ্য মায়ের অশ্রু, অসংখ্য যোদ্ধার সাহসÑ সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই স্বাধীনতা। কিন্তু সেই ইতিহাসে কিছু নাম আলাদা করে দীপ্ত হয়ে থাকেÑ তাদের সাহস, তাদের সিদ্ধান্ত, তাদের ভূমিকা ইতিহাসকে নতুন দিকে মোড় দেয়।
জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম। তিনি দেখিয়েছেন, একজন সৈনিক যখন কেবল আদেশ মানার গণ্ডি ছাড়িয়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তিনি হয়ে ওঠেন ইতিহাসের নির্মাতা। তার জীবন আমাদের শেখায়Ñ সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; সাহস মানে ভয়ের মাঝেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে যে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে, তার প্রতিটি রঙের ভেতর লুকিয়ে আছে ত্যাগের গল্প, রক্তের ইতিহাস, আর বীরত্বের কাহিনী। সেই কাহিনীর এক উজ্জ্বল অধ্যায় জিয়াউর রহমানÑ একজন সৈনিক, একজন স্বাধীনতার ঘোষক, একজন বীরযোদ্ধা, যার অবদান চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক