ভারত
সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬ ১১:৪১ এএম
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হবে না; বরং নির্ধারিত হবে এই অঞ্চলের দেশগুলো কতটা সফলভাবে তাদের বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারে তার ওপর। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) ভারতের কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করায় নতুন করে বৈশ্বিক পর্যায়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) এবং ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং’ (র)-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশ সরাসরি নীতিগত পদক্ষেপে রূপ নেয় না, তবুও এটি বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকারের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের প্রতিফলন।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুত্ববাদী সভ্যতার প্রতীক। এখানে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানসহ নানা ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সহাবস্থান করে আসছে। এই বৈচিত্র্যই ভারতের শক্তি এবং বিশ্বে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে তার পরিচিতির ভিত্তি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকদের নজরে এসেছে। সমালোচকদের মতে, হিন্দুত্ববাদী আদর্শের প্রভাব এবং নির্দিষ্ট কিছু সংগঠনের ভূমিকা ভারতের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ বার বার উঠে আসছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে।
USCIRF-এর তালিকায় ভারতের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই তালিকায় আফগানিস্তান, মিয়ানমার, চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশ রয়েছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগে সমালোচিত। ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশের এই তালিকায় থাকা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ। এই বিতর্ক কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পড়তে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি অঞ্চল, যেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং সামাজিক বৈষম্য দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ভারতের মতো একটি বড় দেশের রাজনৈতিক গতিপথ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের মতো দেশগুলোতেও ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে। যদি ভারত আরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হয়, তবে তা অন্য দেশগুলোকেও একই পথে উৎসাহিত করতে পারে। এতে আঞ্চলিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও রাজনৈতিক দুর্বলতা আরও বাড়তে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক আচরণও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে কৌশলগত বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত ভারতের নীতি অনেক সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে প্রভাবশালী বা একতরফা বলে মনে হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো তাই প্রায়ই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা ও নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে বেড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্ন যুক্ত হলে আঞ্চলিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দেশের ভাবমূর্তি তার অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের ওপরও প্রভাব ফেলে। মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের নীতির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনেই পড়ে।
তবে ভারতকে একমুখীভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশটিতে এখনও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ, স্বাধীন গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং সক্রিয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান। বহু মানুষ এখনও সংবিধানের মূল্যবোধ ও বহুত্ববাদ রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। এই অভ্যন্তরীণ শক্তিগুলোই ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সবশেষে বলা যায়, USCIRF-এর এই সুপারিশকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। ভারতের জন্য এটি একটি সুযোগ তার ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার। আর দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি একটি স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সহনশীলতা, সহাবস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিকত্বের ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হবে না; বরং নির্ধারিত হবে এই অঞ্চলের দেশগুলো কতটা সফলভাবে তাদের বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে পারে তার ওপর। সেই অর্থে, ভারতের পথচলাই পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ও নৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সহিদুল আলম স্বপন
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও কবি