স্বাধীনতা দিবস
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১২:২৪ পিএম
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, গত ৫৫ বছরেও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। দেশের গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে বার বার। রাজনীতিতে ঐকমত্যের অভাব ও অসহিষ্ণুতাও এর বড় কারণ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আজ ২৬ মার্চ, বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস। এ দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরব, আত্মত্যাগ ও মুক্তির প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নৃগোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার অমোঘ পথে যাত্রা শুরু করে। দেশবাসী জীবনপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারপর দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। লাখো শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আমরা অর্জন করি নিজস্ব জাতীয় পরিচিতি। অভ্যুদয় ঘটে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের। তাই স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বেদনারও। আজ এই মহান দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা শ্রদ্ধা জানাই রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাসহ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের, যারা আমাদের পরম গর্বের স্মারক। শ্রদ্ধা জানাই একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে বিভীষিকার শিকার পূর্ব বাংলার জনগণকে, যারা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং এরই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলে মুক্তিসংগ্রাম।
বলার অপেক্ষা রাখে না, কীভাবে রক্তস্নাত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল। যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল বায়ান্নর রাষ্টভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের রক্তসিঁড়ি বেয়ে সে সংগ্রাম ২৫ মার্চের মধ্যরাতে তথা ২৬ মার্চ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে উন্নীত হয়। এদিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের বজ্রকঠিন সংগ্রাম ও হীরণ্ময় বিজয়ের কথা। নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডের সমন্বয়ে বাঙালির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের কথা। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তস্নাত সংগ্রাম শুরুর মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল এ ভূখণ্ডের শোষিত ও বঞ্চিত মানুষ। একাত্তরে রেসকোর্স ময়দানের ৭ মার্চের জনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডাক দিয়েছিলেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ পরে সেনানায়ক জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটান।
মূলত সেদিন পাকিস্তানের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্তিত্ব পুনরুদ্ধারের চূড়ান্ত শপথ নেয় এই ভূখণ্ডের মানুষ। এ চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে কৃষকের সন্তান অস্ত্র ধারণ করেছিলেন, শ্রমিক কারখানার হাতুড়ি ছেড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাংকারে অমিত বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, ছাত্রছাত্রীরা ছেড়েছিলেন ক্যাম্পাস, নারীসমাজ সামলে ছিলেন ঘর ও বাইরের চ্যালেঞ্জ এবং বুদ্ধিজীবীরা অসির বিরুদ্ধে মসিকেই সংগ্রামের হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। বলে রাখা ভালো, একাত্তরে শুধু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নয়, এদেশের কিছু স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিও মুক্তিসংগ্রামীদের রুখে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো নিপীড়নই সেদিন মুক্তিকামী মানুষকে দাবিয়ে রাখা যায়নি।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, গত ৫৫ বছরেও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। দেশের গণতন্ত্র হোঁচট খেয়েছে বার বার। রাজনীতিতে ঐকমত্যের অভাব ও অসহিষ্ণুতাও এর বড় কারণ। স্বাধীনতার পর থেকে যেসব রাজনৈতিক দল দেশ পরিচালনার ভার নিয়েছে, তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, পূর্বাপর সরকার জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণের চেয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থেকেছে। তবে এটা মানতে হবে, স্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে দেশ অনেক এগিয়েছে। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে বলতে হয়, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবনতি ঘটেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়েছে। জনপ্রশাসনের সর্বস্তরে অনিয়ম, জবাবদিহিতার অভাব ক্রমেই প্রকটতর হয়েছে। খুন, ধর্ষণসহ নানা ধরনের গুরুতর অপরাধ বেড়েছে অথচ এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ সবকিছু দেশের উন্নয়নের গতি রোধ করছে।
বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, ধর্মীয় সহিংসতা বাড়ছে এবং মানুষের মধ্য সহনশীলতা কমছে। এখনও শ্রেণিবিশেষে কাউকে কাউকে বৈষম্যের পাশাপাশি হয়রানি ও অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হতে হয়। বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর মধ্যে শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাই বেশি। এ বেকারত্বের হার বৃদ্ধি দেশের জন্য শঙ্কার কারণ। অথচ স্বাধীনতার বাংলাদেশ চেয়েছিল কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হতে। কিন্তু তা এখনও সম্ভব হয়নি। ফলে দেশের মানুষের উন্নত জীবনমান ও পরিবেশ আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আমরা মনে করি, প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন মানুষের সক্ষমতা বাড়বে, জীবনের মান উন্নত হবে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ হবে, যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।
নিকট অতীতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি দেশে দুর্নীতি ও লুটপাটের শাসন কায়েম করেছিল। এর পরিণতি হলো, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতো চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেরও মূল লক্ষ্য ছিল দেশে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু গত ২২ মাসেও দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। যেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তির বিশাল বিজয় আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে। আমরা তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রত্যাশা করছি। আমরা চাই, সরকারের শপথ হোক একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার।
আমরা বিশ্বাস করি, এবারের স্বাধীনতা দিবসের মধ্য দিয়ে একাত্তরের সংগ্রামী চেতনা বর্তমান প্রজন্মসহ সবাইকে আরও শানিত করবে। আমাদের প্রত্যাশাÑ দেশ এগিয়ে যাক উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের পথে। বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রত্যয় আরও দৃঢ় হোকÑ সকল বিভেদ ভুলে গড়ে উঠুক একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ।