২৬ মার্চ
মাহমুদুল হক আনসারী
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১০:১২ এএম
সেই কালরাত্রি থেকেই শুরু হয় মৃত্যু, ধ্বংস, আগুন আর আর্তনাদ, পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ওই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য।
‘মহান স্বাধীনতা গৌরব ও অহংকারের দিন, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত/ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে/নতুন নিশান উড়িয়ে/দামামা বাজিয়ে দিগবিদিক/এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।’ সত্যিই বাংলায় এসেছে সেই মহান স্বাধীনতা। আর আজ বাঙালির সেই গৌরবদীপ্ত দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি।
স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বাংলাদেশের গৌরব ও মালিকানাকে সর্বদা বহির্বিশ্ব থেকে নিরাপদ ও সুসংহত রাখতে হবে। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে লাখ লাখ শহীদের আত্মদানে অর্জিত এই স্বাধীনতাকে যেকোনো ধরনের ষড়যন্ত্র থেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভোৗমত্ব ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জোরদার করতে হবে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাতৃভূমির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সময়োপযোগী আধুনিকায়ন করার মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশকে সুসজ্জিত করার সময়োপযোগী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে। দেশের যুবসমাজকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও শারীরিক শিক্ষা ফিটনেস শিক্ষা স্কুলজীবন থেকে চালু করার দাবি রাখছি। মাতৃভূমির সুরক্ষার জন্য সব ধরনের ডিফেন্সের আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
বাঙালি জাতির জীবনে ২৬ মার্চ দিনটি একই সঙ্গে গৌরব ও শোকের। বাঙালির ওপর পাকিস্তানি শাসকরা শোষণ এবং ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর যে আগ্রাসন চালিয়েছিল, এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধিকারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাঙালিরা। তারা ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ স্বাধীন করার শপথ গ্রহণ করে।
পাকিস্তানের ২৩ বছরের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে প্রতিটি বাঙালির মনে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বীজ রোপিত হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মৃত্যুপণ লড়াই ও রক্তসমুদ্র পাড়ি দিয়ে বীর বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে জাতীয় ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। প্রতিবছর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে দিবসটি উদযাপন করে গোটা জাতি। বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করে স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারী দেশের বীর সন্তানদের।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যুবসমাজকে তৈরি করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সুশৃঙ্খল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সিলেবাস রাখতে হবে। শিক্ষা সিলেবাসে স্বাধীনতার আদর্শ মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই মহান স্বাধীনতা অর্জন করতে বাঙালি জাতিকে করতে হয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, দিতে হয়েছে এক সাগর রক্ত। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরেই ভাষার প্রশ্নে একাত্ম হয় বাঙালি। ১৯৪৮, বায়ান্ন পেরিয়ে চুয়ান্ন, বাষট্টি, ছেষট্টির পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে কেঁপে উঠেছিল জেনারেল আইয়ুবের গদি। জনতার সাগরে সৃষ্টি হয়েছিল উত্তাল স্রোতোধারা। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত ছিল গ্রাম-শহর, জনপদ। কিন্তু বাঙালির হাতে শাসনভার দেওয়ার বদলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে করতে থাকেন কালক্ষেপণ। পর্দার আড়ালে প্রস্তুত হয় হিংস্র কায়দায় বাঙালি হত্যাযজ্ঞের ‘নীলনকশা’।
৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণেই পাওয়া যায় মুক্তির দিকনির্দেশনা। আক্ষরিক অর্থেই তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সেই প্রবল প্রদীপ্ত আন্দোলনের জোয়ারে ধীরে ধীরে বাঙালির হৃদয়ে আঁকা হয় একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের ছবি। কিন্তু বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নির্মূল করতে অস্ত্র হাতে নামে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী। শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে নিষ্ঠুর গণহত্যা।
সেই কালরাত্রি থেকেই শুরু হয় মৃত্যু, ধ্বংস, আগুন আর আর্তনাদ, পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ওই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম অর্জন স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতাকে সর্বস্তরের জনতাকে বুকে ধারণ করতে হবে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাঙালি জাতির অধিকার সব শ্রেণির মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। স্বাধীনতার অর্জন ছাত্র-যুবসমাজ, বৃদ্ধবনিতা সকলেই মিলেমিশে ভোগ করতে হবে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। অর্থনৈতিক শোষণ বন্ধ করতে হবে। সব মানুষের সমান অধিকার রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মাহমুদুল হক আনসারী
কলাম লেখক