২৫ মার্চ, ১৯৭১
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৩ পিএম
২৫ মার্চÑ ইতিহাসে এক বিভীষিকাময়, রক্তাক্ত এবং শোকাবহ রাত। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই কালরাত্রি শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, এটি একটি জাতির ওপর চালানো বর্বরতার প্রতীক, যা আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়; শোকাতুর করে তোলেÑ প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় করে জাতিকে।
সেই রাতের অন্ধকারে শুধু মানুষ হত্যা হয়নি, হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছিল একটি জাতির স্বপ্ন, চেতনা ও ভবিষ্যৎকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালের এই গণহত্যার দিনটিকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্মরণ করে আসছে জাতি। এখানে উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতভাবে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, অপারেশন
সার্চলাইট নামে চালানো হয় ইতিহাসের নৃশংসতম এই গণহত্যা। সেই রাতে নিরীহ বাঙালি
সারাদিনের কর্মব্যস্ততা শেষে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠিক সেই সময়ই ভয়ংকর হায়েনার মতো
ঝাঁপিয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। হিংস্র শ্বাপদের মতো জলপাই রঙের ট্যাংকগুলো রাত সাড়ে
১১টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে জিপ-ট্রাক বোঝাই করে নরঘাতক কাপুরুষ পাকিস্তানের সৈন্যরা
ট্যাংকসহ আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। বিশেষ করে, ঢাকার রাজারবাগ
পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাসপাতাল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে আকাশ-বাতাস
কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে আধুনিক রাইফেল, মেশিনগান ও মর্টার। হতচকিত বাঙালি কিছু বুঝে
ওঠার আগেই ঢলে পড়তে থাকে মৃত্যুর কোলে।
শহরজুড়ে লাশের পর লাশ। সহজ করে বললে,
মধ্যরাতের ঢাকা তখন লাশের শহর। এমন হত্যাযজ্ঞে স্তম্ভিত বিশ্ববিবেক। সে রাতে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকা গণমাধ্যমও রেহাই পায়নি জল্লাদ ইয়াহিয়ার
পরিকল্পনা থেকে। অগ্নিসংযোগ, মর্টার শেল ছুড়ে একে একে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ,
ডেইলি পিপল ও জাতীয় প্রেস ক্লাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
জীবন দিতে হয় বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকেও। ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময়
গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য. ড. মনিরুজ্জামানসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বেশ কয়েকজন শিক্ষককে হত্যা করা হয় নিষ্ঠুরভাবে। সেদিন শুধু ঢাকা নয়, রাজশাহী,
চট্টগ্রাম, রংপুরসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতেও চলে বর্বর মারণযজ্ঞ। এই নৃশংসতার পেছনে
ছিল একটি গভীর ষড়যন্ত্রÑ পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের
বাংলাভাষী নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে রক্তের স্রোতে
ডুবিয়ে দেওয়া। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মারণাস্ত্রের ভাষায় কোনো জাতির
স্বাধীনতার স্বপ্নকে দমন করা যায় না। বরং এই হত্যাযজ্ঞই তদানীন্তন পূর্ব
পাকিস্তানিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুক্তির সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে এবং একসময়
তা রূপ নেয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে।
পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর এই মারণযজ্ঞকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে
স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি
মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান ২৫ মার্চের গণহত্যাকে ‘গণহত্যা দিবস’
হিসেবে স্বীকৃতির একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আমরা মনে করি, ২৫ মার্চের
এই গণহত্যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত না পেলেও এটি ছিল এক সুপরিকল্পিত গণহত্যা, যা মানবতার
ইতিহাসে চিরকাল কলঙ্ক হয়ে থাকবে।
আমরা আরও মনে করি, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ২৫ মার্চের
তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ইতিহাস কখনও শুধুই অতীত নয়, তা
বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। আজকের বাংলাদেশে যখন বিভাজন, সহিংসতা, ভিন্নমত
দমনের প্রবণতা কিংবা ইতিহাস বিকৃতির নানা প্রচেষ্টা চোখে পড়ে, তখন ২৫ মার্চের শিক্ষা
নতুন করে সামনে আসে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছেÑ অন্যায় ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধই জাতির মুক্তির পথ। অথচ আজ যদি আমরা নিজেরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ
ছড়াই, সহনশীলতা হারিয়ে ফেলি, কিংবা সত্যকে আড়াল করি তবে তা সেই অন্ধকার শক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত
করার শামিল, যে শক্তি ২৫ মার্চে গণহত্যা চালিয়েছিল।
বর্তমান প্রজন্মের কাছেও এই দিনের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্টÑ
স্বাধীনতা শুধু অর্জনের বিষয় নয়, এটি রক্ষারও
বিষয়। স্বাধীনতার চেতনা মানে কেবল একটি ভূখণ্ড নয়; এটি ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের
স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা। যদি এসব মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে
স্বাধীনতার মূল চেতনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আজকের বিশ্বে যখন বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, তখন ২৫ মার্চ আমাদের মানবতার পক্ষেও দাঁড়াতে শেখায়। আজকের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোকÑ ইতিহাসকে বিকৃত হতে দেব না, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না এবং স্বাধীনতার চেতনাকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করব। তবেই ২৫ মার্চের সেই শহীদদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পাবে। আমাদের প্রতিজ্ঞা হোকÑ ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতকে কখনও ভুলব না।