বিশ্লেষণ
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৪৪ পিএম
আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৯ পিএম
ফেসবুকের প্রতি মানুষের আসক্তি দিন দিন বাড়ছে। এই আসক্তি শুধু কম বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বয়স্করাও ইদানীং ফেসবুক নিয়ে মেতে উঠেছেন। অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানদের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করেন। নানা ধরনের খেলাধুলায় অংশ নেন।
ফেসবুক
বিশ্বে দুই ধরনের মা-বাবা রয়েছেন। একশ্রেণির মা-বাবা আছেন, যারা ফেসবুক সম্পর্কে খুব
বেশি কিছু জানেন না বা বোঝেন না এবং বুঝতে বা জানতে আগ্রহীও নন। অন্যদিকে একশ্রেণির
মা-বাবা তাদের সন্তানদের ফেসবুক বন্ধু। তারা একে অপরের সঙ্গে অনলাইনে খোশগল্প করেন
ও আড্ডা দেন, ছবি লাইক করেন, মন্তব্য করেন এবং ড্রয়িংরুম থেকে বেডরুমে বার্তা পাঠান।
বিবেকবান ও চিন্তাশীল মা-বাবারা তাদের সন্তানদের ফেসবুক নিয়ে আচরণ লক্ষ করতে পারেন এবং সেটা আসক্তির পর্যায়ে যাওয়ার আগেই পরিণতি সম্পর্কে তাদের বোঝাতে পারেন, সাবধান করে দিতে পারেন। ঘরে বা নজরে থাকলে ছেলেমেয়েরা মা-বাবার পরামর্শ বা উপদেশ গ্রহণ করে।
কিন্তু ঘরের বাইরে অবস্থানকালে ফেসবুক ব্যবহারে তারা আবারও প্ররোচিত বা অনুপ্রাণিত হয়ে পড়ে। ফেসবুক আসক্তির পেছেনে স্মার্টফোন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মা-বাবারা স্মার্টফোন নজরে রাখতে পারেন না বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এ ধরনের সমস্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলেন তা নিয়ে জোর তর্কবিতর্ক চলছেÑ এটা আমি আগেই উল্লেখ করেছি।
তবে আমি যা বুঝি তা হলো, সব রকম মানসিক সংকটের মতো ফেসবুক আসক্তি সংকট যদি মানসিক ও শারীরিক সংকটে রূপ নেয়, তার জন্য ‘কুইক ফিক্স’ বা সহজ সমাধান বলতে কিছু নেই। আমরা যা করতে পারি তা হলো, আমাদের ও ছেলেমেয়েদের আচার-আচরণ নিয়ে একটু ভাবা এবং তা যদি ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যার কারণ হয়, তবে তা পরিবর্তনের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।
যদি ফেসবুক
আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক সময় নষ্ট করে, আমাদের পড়াশোনা, পারিবারিক ও
সামাজিক বন্ধন, খেলাধুলা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সময় নষ্ট করে, তবে তা এক বিরাট সমস্যা
হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সুস্থ, সুন্দর, সুখী ও অর্থবহ জীবনের জন্য আমাদের ব্যক্তিগত,
পারিবারিক ও সামাজিক কাজকর্মে একটি স্বাস্থ্যসম্মত ভারসাম্য থাকতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ ও উন্নয়নকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না, না পারি তা রুখতে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, নিজের স্বকীয়তাকে বিসর্জন দিয়ে আমরা প্রযুক্তির দাসে পরিণত
হব।
নরওয়ের গবেষকরা ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ‘সাইকোলজিক্যাল জার্নালে’ প্রথম ফেসবুক আসক্তি মাপার এক মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রকাশ করেন। তারা আশা করেন, বিশ্বের গবেষকরা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ফেসবুক ব্যবহার সংক্রান্ত সব সমস্যা বা সংকট বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন। সমসাময়িককালে একই জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে গবেষকরা ফেসবুক আসক্তি মাপার আরও একটি বাস্তবধর্মী পন্থার কথা উল্লেখ করেন।
তারা মনে করেন, ফেসবুক ব্যবহার নিছক এক ধরনের কার্যক্রম, আসক্তি
নয়। কারণ, ফেসবুক এখন শুধু আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম নয়। তার চেয়েও অনেক বেশি। ফেসবুকের
মাধ্যমে মানুষ এখন ভিডিও ও সিনেমা দেখতে পারে, নানা ধরনের বিচিত্র খেলা খেলতে পারে,
এমনকি ফেসবুকে জুয়া পর্যন্ত খেলা যায়। ফেসবুক আসক্তি মাপার এই নতুন পদ্ধতিকে বলা হয়,
‘বের্গেন ফেসবুক অ্যাডিকশন স্কেল’।
ড. সিসিলে অ্যানড্রিয়াসেন নরওয়ের বের্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক এবং তিনি ফেসবুক আসক্তি সম্পর্কিত একটি প্রকল্পের ওপর কাজ করেছেন। ড. অ্যানড্রিয়াসেন ও তার সহকর্মীরা ফেসবুক আসক্তি পরিমাপের জন্য ছয়টি সূচক নির্ণয় করেছেন। গবেষকরা ২২৭ জন ছাত্র এবং ১৯৬ জন ছাত্রীকে একটি প্রশ্নমালা দিয়ে তা পূরণ করার জন্য বলেন। প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য পাঁচটি অপশন ছিল।
অপশনগুলো হলোÑ অতি কদাচিৎ, কদাচিৎ, মাঝে মাঝে, ঘন ঘন এবং অতি ঘন ঘন। প্রথম প্রশ্ন ছিল, তুমি ফেসবুক নিয়ে ভাবার জন্য এবং কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে অনেক সময় ব্যয় কর; দ্বিতীয় প্রশ্ন, বেশি বেশি ফেসবুক ব্যবহার করার তাগিদ অনুভব কর; তৃতীয়, তুমি নিজের সমস্যাবলি ভুলে যাওয়ার জন্য ফেসবুক ব্যবহার কর; চতুর্থ, তুমি ফেসবুক ব্যবহারের সময় কমাতে ব্যর্থভাবে চেষ্টা করেছ; পঞ্চম, ফেসবুক ব্যবহারে বাধা দিলে তুমি অস্থির হয়ে যাও বা ক্ষেপে যাও এবং ষষ্ঠ, মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহার করার কারণে তোমার পড়াশোনা বা চাকরির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
ড. অ্যানড্রিয়াসেন ও তার সহকর্মীরা মনে করেন, ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে চারটিতে যদি উত্তর হয় ঘন ঘন বা অতি ঘন ঘন, তবে উত্তরদাতা ফেসবুকে আসক্ত বলে ধরে নিতে হবে। প্রশ্নাবলির উত্তর থেকে দেখা গেছে যে, অধিকাংশ উত্তরদাতা খুব দেরি করে ঘুমাতে যায় এবং দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। বয়স্কদের চেয়ে যুবক-যুবতিরাই ফেসবুক আসক্তিতে আক্রান্ত বেশি।
ফেসবুক আসক্তি সংকট থেকে পরিত্রাণের জন্য আমি নিম্নে কিছু পরামর্শ উপস্থাপন করছি। কারও কাছে কোনো কোনো পরামর্শ উদ্ভট মনে হতে পারে। তারপরও কেউ ভালো মনে করলে গ্রহণ করতে পারেন। এক, আপনি যদি ফেসবুক ইউজার হয়ে থাকেন, তবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্বীকার করুন আপনার সমস্যা রয়েছে।
আপনার সমস্যা আপনি যদি বুঝতে না পারেন বা স্বীকার না করেন, তবে তা থেকে উত্তরণের পথ পেতে আপনি উৎসাহী হবেন না। দুই, ওপরের আলোচনা থেকে বুঝতে চেষ্ট করুন আপনি ফেসবুকে আসক্ত কি না। তা জানার জন্য বের্গেন অ্যাডিকশন স্কেল ব্যবহার করতে পারেন। তিন, আপনি ফেসবুকে কত সময় কাটাচ্ছেন, তার একটা হিসাব রাখুন। হিসাবের মধ্যে থাকবে, আপনি দিনে কতবার ফেসবুকে লগ অন করেছেন, কত সময় আপনি লগ অন অবস্থায় থেকেছেন, এবং ফেসবুকে আপনার কাজগুলো কী কী ছিল (যেমন পোস্টিং, কমেন্টিং, খবর পড়া, খেলাধুলা ইত্যাদি)।
আপনি ফেসবুক আসক্তি থেকে বের হতে চাইলে আগে ঠিক করুন ফেসবুক আপনার জন্য কতটুকু সমস্যা তৈরি করছে। আপনি যত সময ফেসবুকে কাটাচ্ছেন, তা আপনার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও মা-বাবা কোন দৃষ্টিতে দেখছেন, তা জানার চেষ্টা করুন। তারা কী মনে করেন যে আপনি ফেসবুকে আসক্ত? ফেসবুকে সময় কমিয়ে দিলে আত্মীয়-স্বজন বা মা-বাবার সঙ্গে আপনার সম্পর্কের উন্নতি হবে বলে কি আপনি মনে করেন? চার, অধিকাংশ মানুষের জন্য এক থেকে দেড় ঘণ্টা ফেসবুকে কাটানো যথেষ্ট সময়।
এই সময়ের মধ্যে ফেসবুকে আপনি যা করতে চান তা শেষ করে উঠে পড়ুন। উদ্দেশ্যহীনভাবে ফেসবুক নিয়ে অযথা সময় কাটাবেন না। দৈনন্দিন জীবনের দরকারি কাজ সেরে ফেসবুক নিয়ে বসুন। পাঁচ, ফেসবুকে লগ অন করে বসলে সময় কীভাবে চলে যাবে আপনি টের পাবেন না।
তাই সঙ্গে একটি টাইমার
নিয়ে বসুন। নির্দিষ্ট সময় শেষ হলে টাইমার আপনাকে উঠে যাওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে সাহায্য
করবে। ছয়, আপনার বন্ধু সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখুন। আপনার বন্ধু সংখ্যা যত বেশি হবে, আপনার
ব্যস্ততাও তত বেশি হবে। বন্ধু সংখ্যার চেয়ে বন্ধুর গুণগত মান অনেক শ্রেয়।
সম্প্রতি কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি কেউ কাউকে বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দেয়, তবে বাস্তব জীবনে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে তাকে এড়িয়ে চলার ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বিরক্তিকর বন্ধুর আপডেট লুকিয়ে রাখাই নিরাপদ অপশন।
সাত, সপ্তাহে অন্তত দুই দিন ফেসবুক ফ্রি বা ফেসবুক মুক্ত দিন রাখুন। যত ইচ্ছাই জাগুক, এই দুই দিনে একদম ফেসবুক লগ অন করবেন না। আপনার ফেসবুকের অপ্রয়োজনীয় ও সময় অপচয়কারী অ্যাপ্লিকেশনগুলো ডিলিট করে ফেলুন। আট, আপনার এলোপাতাড়ি চিন্তা, ভাবনা বা পরিবর্তিত আবেগের ওপর স্ট্যাটাস সারা দিন ধরে একাধিকবার আপলোড করবেন না। সপ্তাহে শুধু একবার আপনার স্ট্যাটাস আপডেট করুন।
এসব পরামর্শ কাজ না করলে তবে মজা করে বলি, ফেসবুক আসক্তি সিন্ড্রম উপশমের জন্য নিচের চরম পন্থাগুলো গ্রহণ করতে পারেন। প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি যা করবেন তা হলো, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বেশি সময় কাটান, ধীরগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিন বা ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দিন, বই পড়ুন।
আপনার অবস্থা সংকটপূর্ণ হলে চোখ বন্ধ করে আপনার ফেসবুকের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে ফেলুন, ইন্টারনেটের সংযোগ কেটে দিন অথবা আপনার ল্যাপটপ ডাস্টবিনে ফেলে দিন। তাতেও যদি কাজ না হয় তবে একটিমাত্র পরামর্শ বাকি থাকে। আর তা হলো, ফেসবুক বাদ দিয়ে আপনি সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করে বনে-জঙ্গলে চলে যান। তাতে নিশ্চিত আপনার ফেসবুক আকর্ষণ দূর হবে, আসক্তিও থাকবে না। এ ছাড়া আর কোনো পরামর্শ থাকলে আপনারা যোগ করে নিতে পারেন।
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ
প্রফেসর, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সাবেক প্রফেসর ও ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়