প্রেক্ষাপট
প্রাইমা হোসাইন
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩৩ পিএম
প্রতীকী ছবি
সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শক্তি নারী। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নারীর অবদান রয়েছে, যদিও বহু সময় সেই অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি পায়নি। আজকের বিশ্বে নারীরা শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতিÑ প্রায় সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবুও নারীর অগ্রযাত্রার পথে এখনও নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। একটি উন্নত ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।
এ কথা সত্য, বাংলাদেশের
অগ্রগতি বলি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলি, এসবের পেছনে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো নারীসমাজ
এবং তাদের শ্রম। একসময় ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকা নারীরা সময়ের হাত ধরে আজ দেশের
উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, শিক্ষা,
স্বাস্থ্য, ব্যাংক-বীমা, তথ্যপ্রযুক্তিÑ সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ সমভাবে দৃশ্যমান।
কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আমাদের জাতীয় আয়ে নারীর শ্রমের অবদান যথাযথভাবে আজও মূল্যায়িত
হয় না। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রÑ তিন স্তরেই নারীর শ্রম এখনও বৈষম্যের শিকার। বলা
যায়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রে নারীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি অনেক সময়
স্বীকৃত নয় এবং প্রাপ্য মর্যাদা থেকেও বঞ্চিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
নারীর অগ্রগতি সত্যিই উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, কর্মক্ষেত্রে
নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার উচ্চ পর্যায়েও নারীরা নেতৃত্ব
দিচ্ছেন। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনÑ সবখানেই নারীর
সক্রিয় ভূমিকা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। প্রবাসেও বহু বাংলাদেশি নারী দক্ষতা
ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন।
সাফল্যের ঝুড়িতে
এত অবদানের পরও সবচেয়ে বড় অবহেলার জায়গা হলো ঘরে নারীদের শ্রমের অবদানগুলো। রান্না,
সন্তান লালনপালন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার সেবা, গৃহস্থালির নানা কাজÑ এসবই দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের
অপরিহার্য অংশ। যদি এ কাজগুলো বাজারমূল্যে হিসাব করা হতো, তাহলে জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানে
নারীর অবদান আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাব অনুযায়ী,
গৃহস্থালির কাজকে অর্থনৈতিক অবদান হিসেবে গণনা করলে অনেক দেশের জিডিপি কয়েক শতাংশ বেড়ে
যায়। অথচ বাংলাদেশে এখনও এসব শ্রমকে অদৃশ্য বলা হয়, কারণ এর বিনিময়ে নারীরা কোনো অর্থ
পান না। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যেখানে
প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে, এর মধ্যে ৬০-৬৫ শতাংশই নারী। এ খাত থেকে বছরে যে পরিমাণ
বৈদেশিক মুদ্রা আসে, তার বড় অংশই নারী শ্রমের অবদান। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠেÑ
এই শ্রমিকরা কি ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন। দুঃখজনক
হলেও সত্য, অধিকাংশ নারীশ্রমিক এখনও বেতনবৈষম্য, হয়রানি ও স্বাস্থ্যঝুঁকির শিকার। কৃষি
খাতেও নারীর অবদান অনস্বীকার্য। বীজ বপন, চারা রোপণ, শস্য কাটাসহ নানা কাজে নারীরা
পরিশ্রম করে, অথচ কৃষিশ্রমিক হিসেবে তাদের নাম সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে আসে না। গ্রামের
নারী কৃষকরা পরিবার ও সমাজের কাছে ‘সহযোগী’ হিসেবে পরিচিত থাকেন, প্রকৃত কৃষক হিসেবে
নয়। ফলে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তাদের দাবিদাওয়া গুরুত্ব পায় না।
নারীরা এখনও নানা
ধরনের বৈষম্য ও বাধার মুখোমুখি হন। সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে
বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা ইত্যাদি সমস্যা অনেক নারীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে
বাধাগ্রস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা সমান কাজ করেও সমান মর্যাদা বা সুযোগ পান না।
গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়া এবং দারিদ্র্যের কারণে বহু মেধাবী মেয়ে তাদের
শিক্ষা বা কর্মজীবন এগিয়ে নিতে পারে না।
নারীর অগ্রযাত্রা
নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রÑ সব
স্তরে নারীর প্রতি সম্মান ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।
পরিসংখ্যানের
দিকে তাকালে আফ্রিকার কিছু দেশে মোবাইল মানির প্রসার নারীদের আয়ের ধারাকে মূলধারায়
এনেছে। আগে যেখানে নারীরা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন এখন মোবাইল মানির মাধ্যমে
তারা লেনদেন, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে পারছেন। এতে তাদের আর্থিক ক্ষমতায়ন বেড়েছে এবং স্থানীয়
অর্থনীতি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। ভারতের অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেখানে
নারী উদ্যোক্তা গ্রুপগুলোকে সমষ্টিগতভাবে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু আছে। এর ফলে পুনঃপরিশোধের
হার আশ্চর্যজনকভাবে বেশি হয়েছে। শুধু তাই নয়, কেনিয়াতে এম-পেসার মতো মোবাইল ফিনটেক
প্লাটফর্ম নারীদের ক্ষুদ্র ব্যবসায় দ্রুত মূলধন জোগাড়ের সুযোগ দিয়েছে। ইথিওপিয়াতে নারীকেন্দ্রিক
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। রুয়ান্ডাতে
আবার সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করে নারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ
এবং মার্কেট অ্যাক্সেস প্রোগ্রাম চালু করেছে। বাংলাদেশের জন্য এসব মডেল কার্যকর হতে
পারেÑ বিশেষ করে, নারীদের ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন, ডিজিটাল আর্থিক সাক্ষরতা এবং মোবাইলভিত্তিক
সেবা বাড়ানোর ক্ষেত্রে। আমাদের নারীরা যদি সম্মিলিতভাবে পুঁজির জোগান পান এবং ডিজিটাল
দক্ষতা অর্জন করেন তবে তাদের ব্যবসা টেকসই হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও দৃশ্যমান
প্রভাব ফেলবে।
একটি দেশের অগ্রগতি কখনোই পূর্ণতা পায় না যদি তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী পিছিয়ে থাকে। তাই নারীর অগ্রযাত্রা কেবল নারীর বিষয় নয়, এটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের প্রশ্ন। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি সমাজ গড়ে উঠুক যেখানে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, নারীসমাজের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। তাই রাষ্ট্র ও সমাজকে নারীর প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং উন্নয়নের মূলধারায় তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণই হবে আগামীর স্বপ্নের বাংলাদেশ। নারীর পথের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হোকÑ এই প্রত্যাশাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
প্রাইমা হোসাইন
সমাজসেবিকা ও সংগঠক