মো: মামুন হাসান
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৬:৫৫ পিএম
আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬ ২১:০০ পিএম
মো: মামুন হাসান; সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
পবিত্র ঈদুল ফিতর মানেই আনন্দ, ভালোবাসা আর মিলনের উৎসব। এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে এই দিনটি, যখন চারপাশ ভরে ওঠে নতুন জামার ঘ্রাণে, সেমাইয়ের মিষ্টি স্বাদে আর প্রিয়জনদের হাসিতে। কিন্তু সব আনন্দের মাঝেও কিছু মানুষের হৃদয়ে থেকে যায় এক গভীর শূন্যতা—বাবার অভাব। তখন ঈদের আনন্দ আর পুরোপুরি পূর্ণতা পায় না; বরং প্রতিটি খুশির ভেতর লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য বেদনা।
ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল বাবার হাত ধরে বাজারে যাওয়া। নতুন জামা কেনার সময় বাবার চোখে যে আনন্দ ঝলমল করত, তা যেন নিজের আনন্দকেও ছাপিয়ে যেত। “আরেকটা নাও, ভালো লাগলে নাও”—বাবার সেই সহজ কথাগুলোই ছিল ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ।
আমাদের ছেলেবেলার ঈদ ছিল নব্বই দশকের। তখন পবিত্র রমজান শেষে ঈদের চাঁদ দেখার বিষয়টি ছিল এক ধরনের উৎসব। ‘চানরাত’ মানেই ছিল আনন্দের শুরু—পড়াশোনার ছুটি, সীমাহীন উচ্ছ্বাস, আর মহল্লাজুড়ে কোলাহল। রেডিও বা টেলিভিশনে চাঁদ দেখার ঘোষণা শোনার জন্য অপেক্ষা ছিল এক বিশেষ অনুভূতি। ঈদের আগের রাতে বাবার সঙ্গে চাঁদ দেখা, আর চাঁদ উঠলেই একসঙ্গে “ঈদ মোবারক” বলা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ। চাঁদ দেখা গেলে শিশু-কিশোররা ঘর থেকে বের হয়ে একসঙ্গে আনন্দ করত, বাজি-পটকা ফোটাত, আর পুরো পরিবেশ হয়ে উঠত প্রাণবন্ত। এই আনন্দ ছিল সমষ্টিগত, আন্তরিক এবং একেবারেই নির্মল।
ঈদের সকালটা শুরু হতো বাবার ডাকে। ভোরে উঠে ফজরের নামাজ, গোসল, নতুন কাপড় পরা—তারপর বাবার সঙ্গে ঈদের নামাজে যাওয়া। নামাজ শেষে বাবা যখন বুকে জড়িয়ে ধরতেন, তখন মনে হতো পৃথিবীর সব নিরাপত্তা যেন এই এক আলিঙ্গনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। এরপর শুরু হতো আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি ঘুরে বেড়ানো—আর বাবা থাকতেন ছায়ার মতো পাশে।
কিন্তু সময়ের নিষ্ঠুর নিয়মে একদিন সেই ছায়া হারিয়ে যায়। ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আমার বাবা মতিউর রহমান সরকার মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকগমন করেন। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন। বাবা আর নেই, অথচ ঈদ ঠিকই আসে। চারপাশে আগের মতোই আনন্দ থাকে, কিন্তু নিজের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে যায়। নতুন জামা কেনা হয়, কিন্তু বাবার সেই প্রশংসার চোখ আর থাকে না। সেমাই রান্না হয়, কিন্তু বাবার প্রিয় স্বাদ যেন কোথাও হারিয়ে যায়।
ঈদের সকালেও আর কেউ আগের মতো ডেকে তোলে না। নামাজে যাওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু বাবার হাতটি আর ধরা হয় না। নামাজ শেষে সবাই যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, তখন মনে পড়ে—এই জায়গাটাতেই বাবা দাঁড়িয়ে থাকতেন। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে ওঠে।
বাবাহীন ঈদ মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়, বরং একটি অনুভূতির জগত হারিয়ে ফেলা। বাবা ছিলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু—নিঃশব্দে সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সবাইকে হাসিখুশি রাখতেন। ঈদের বাজার, পরিবারের খরচ, সবার চাহিদা—সবকিছু তিনি এমনভাবে সামলাতেন, যেন কোনো কষ্টই নেই। অথচ তার অনুপস্থিতিতে বোঝা যায়, তিনি কতটা অপরিহার্য ছিলেন।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। ঈদ আসে, মানুষ নতুন করে বাঁচতে শেখে। বাবার স্মৃতিগুলো তখন হয়ে ওঠে শক্তির উৎস। তার শেখানো মূল্যবোধ, তার দেওয়া ভালোবাসা, তার দায়িত্ববোধ—এসবই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। আমরা চেষ্টা করি বাবার মতো হতে, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে, অন্যদের মুখে হাসি ফোটাতে। বাবার অনুপস্থিতিতে ঈদের আনন্দ হয়তো আগের মতো থাকে না, কিন্তু তার স্মৃতিগুলো ঈদকে অন্যরকম এক গভীরতায় ভরিয়ে দেয়। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসলে বাবার গল্প উঠে আসে—তার হাসি, তার রাগ, তার স্নেহ—সবকিছু যেন আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে স্মৃতির পাতায়।
ঈদের দিনে বাবার কবর জিয়ারত করা অনেকের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়, বাবা হয়তো আমাদের দেখছেন, আমাদের জন্য দোয়া করছেন। চোখে জল আসে, কিন্তু সেই জলেই লুকিয়ে থাকে এক ধরনের শান্তি—যেন সম্পর্কটা এখনো অটুট, শুধু রূপটা বদলে গেছে। সমাজের অনেকেই হয়তো এই শূন্যতাকে পুরোপুরি বুঝতে পারে না। বাইরে থেকে দেখা যায় হাসি, উৎসব, আনন্দ—কিন্তু ভেতরের বেদনা অদৃশ্যই থেকে যায়। আর এই অদৃশ্য কষ্টটাই সবচেয়ে গভীর।
তবে এই কষ্টের মাঝেও রয়েছে একটি বড় শিক্ষা। আমরা বুঝতে পারি, প্রিয়জনদের গুরুত্ব কতটা। যারা এখনো বাবা-মাকে কাছে পেয়েছে, তাদের উচিত প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্য দেওয়া। কারণ একদিন এই মুহূর্তগুলোই হয়ে যাবে স্মৃতি, আর সেই স্মৃতির ওপর ভর করেই কাটাতে হবে জীবন। ঈদুল ফিতর আমাদের শুধু আনন্দই শেখায় না, শেখায় ভাগ করে নিতে—ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর স্মৃতি। বাবাহীন ঈদ হয়তো নিঃসঙ্গতার গল্প বলে, কিন্তু একই সঙ্গে বলে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর গল্পও।
শেষ পর্যন্ত, ঈদের চাঁদ যখন আকাশে ওঠে, তখন মনে হয়—বাবা হয়তো কোথাও থেকে সেই চাঁদটাকেই দেখছেন। আর আমরা নিঃশব্দে বলি—“ঈদ মোবারক, বাবা। তুমি নেই, তবুও তুমি আছো—আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি ঈদের আনন্দ আর অশ্রুর ভেতরে”।
সবাইকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
লেখক:
মো: মামুন হাসান
সিনিয়র তথ্য অফিসার, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়