ঈদুল ফিতর
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৫:৩০ পিএম
ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য আনন্দ ও আত্মশুদ্ধির উৎসব। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য আনন্দ ও আত্মশুদ্ধির উৎসব। মুসলমানদের সবচেয়ে অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব এটি। এক মাসের সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর আমাদের সামনে হাজির হয় নতুন আশা, সংযম ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে। পবিত্র রমজান মাসে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধৈর্য এবং আল্লাহভীতির যে শিক্ষা আমরা অর্জন করিÑ সেই শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ারই এক মহৎ উপলক্ষ এই ঈদ। ঈদের দিন নতুন জামাকাপড় পরে মুসল্লিরা সকালেই ঈদগাহে নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহর কাছে রমজানের সব আমল কবুলের আরজি পেশ করেন। পারস্পরিক কুশলবিনিময়, সালাম-মুসাফাহা-কোলাকুলি আর নানা স্বাদের খাবারের আয়োজন-আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে দিনটি আনন্দময় হয়ে ওঠে। ঈদুল ফিতরে জাকাত-ফিতরা ও সাধারণ দানের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র-অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার আহ্বান জানায় শিক্ষা-সম্প্রীতির সমাজ গঠনে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতর একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। গ্রাম থেকে শহর, ধনী থেকে দরিদ্রÑ সবাই একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। এই আনন্দের মাঝেও আমাদের মনে রাখতে হবেÑ এখনও অনেক মানুষ আছেন, যারা ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা থেকেও বঞ্চিত। তাই ঈদের খুশি সবার মাঝে পৌঁছে দিতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রÑ সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উৎসব-পার্বণে মানুষ চায় প্রিয়জনের সান্নিধ্য। স্বাভাবিকভাবেই উৎসব ঘিরে মানুষের আবেগ বেশি। কর্মক্লান্ত মানুষ ঘরে ফিরতে চায়। কিন্তু সে যাত্রাপথ সুখকর হওয়ার অভিজ্ঞতা কম। একদিকে টিকিট প্রাপ্তির বিড়ম্বনা, বাড়তি দাম আর এর সঙ্গে যুক্ত হয় পথের বাড়তি দুর্ভোগ। পথে প্রয়োজনীয় যানবাহনের যেমন সংকট থাকে, অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরুর ঘোষণামাত্র ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যায় সব টিকিট। বাস ও ট্রেনের অগ্রিম টিকিট হারিয়ে যাওয়া, অধিক মূল্যে বিক্রিÑ নানা প্রশ্ন দাঁড় করায়। আমরা বরাবরই মানুষের টিকিট প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করি। তেমনি প্রত্যাশা করি, কেউ যেন সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে না পারে।
ঈদে বাড়ি যাওয়া ও ফেরার পথে সতর্কতার বিকল্প নেই। ঈদে বাস-ট্রেন-লঞ্চ যাত্রায় মানুষ যেন ভোগান্তি না পোহায় সেজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। যানজট নিরসনে এবার এসব স্থানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সমন্বয়ে কাজ করছে। একইভাবে ঈদ উদ্যাপন শেষে মানুষ যেন নিরাপদে আবার কর্মস্থলে ফিরতে পারে, কর্মস্থলমুখী মানুষকে যেন দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, যানজটে নাকাল হতে না হয় সেদিকটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবারই দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ার চিত্র দেখা যায়। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়। এসব উদ্যোগ যেন যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, ফিটনেসবিহীন গাড়ি যেন পথে নামতে না পারে, চালকদের যেন যথাযথ বিশ্রামের সুযোগ থাকে এ দিকগুলোতে নজর দিতে হবে। ধারণক্ষমতার চেয়ে কেউই যেন অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে গন্তব্যে রওনা করতে না পারে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনা রোধে প্রচার এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি রেলওয়ের শিডিউল যেন ভেঙে না পড়ে সেদিকেও নজর দিতে হবে। এদিকে ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীর কোথাও যেন দুর্বৃত্তদের কালো থাবার বিস্তার না ঘটে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বাড়তি সতর্কতার কথাও বলা হয়েছে। আশা করি, সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে একটি নির্বাচিত নতুন সরকার এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তাই বিগত সময়ের চেয়ে জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক মানুষের জন্য ঈদের আনন্দ এখনও সীমিত হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কষ্ট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে। সরকারের কাছে প্রত্যাশাÑ তারা যেন জনগণের এই মৌলিক চাহিদাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখে। কারণ ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সব শ্রেণির মানুষ সমানভাবে তা উপভোগ করতে পারে।
মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের ওপর বর্বরোচিত হামলা চলমান। প্রতিদিনই বিশ্ববিব্কেকে কাঁদিয়ে হত্যা করা হচ্ছে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। ধ্বংস করা হচ্ছে, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও বিপুল সম্পদ। ঈদুল ফিতরে সেই নিরীহ মানুষের কাছে আনন্দের বার্তা বয়ে আনুক, সে লক্ষ্যে বিশ্ববিবেক জাগ্রত হোকÑ এটা আমাদের প্রত্যাশা। প্রতিবেশী মিয়ানমারের কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বোঝা বহন করতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের প্রত্যাশা যেমন বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, তেমন আমরা প্রত্যাশা করি দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে সরকারের প্রচেষ্টায় বিশ্বসম্প্রদায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
ঈদ হোক সত্যিকারের আনন্দ ও স্বস্তির। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখা এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিত করা, পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক, নির্বিঘ্ন যাতায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখাও জরুরি। আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলি, যেখানে ঈদ মানেই হবে হাসি, স্বস্তি ও সম্প্রীতির উৎসব। আমাদের পাঠক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, হকার এবং শুভানুধ্যায়ীদের জানাই ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা। সবার জীবন হোক আনন্দময়। ঈদ মোবারক।