× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈদুল ফিতর

উৎসব, ইবাদত ও সামাজিক আবেদন

মুফতি এনায়েতুল্লাহ

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৭ পিএম

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৫:৩৩ পিএম

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, শিক্ষক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মুফতি এনায়েতুল্লাহ, শিক্ষক ও কলাম লেখক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মুসলমানদের ঈদ দুটিÑ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। রমজানুল মোবারকের পরেই আসে শাওয়াল মাস। শাওয়ালের পহেলা তারিখেই ঈদুল ফিতর অনুষ্ঠিত হয়। ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। এটা যেমন দ্বীনিভাবে, তেমনি পার্থিব ও জাগতিক দিক থেকেও। যারা হক আদায় করে, যথার্থ নিয়ত ও সদাচারের সঙ্গে গুনাহমুক্ত থেকে সারা মাস রোজা রেখেছেন ঈদের দিনটি তাদের জন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও পুরস্কারপ্রাপ্তির দিন। অপর দিকে টানা এক মাস দিনের বেলায় ক্ষুধার্ত, পিপাসার্ত ও সংযত থেকে রোজা রাখার পর প্রথম এ দিনটিতে দিনের বেলায় খানাপিনার সুন্দর সুযোগ থাকে। অনুমোদিত পর্যায় পর্যন্ত আনন্দ করা, ভালো পোশাক পরা, সুগন্ধি ব্যবহার ও ভালো খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকে। 

ঈদের সামাজিক আবেদনের একটি বিরাট দিগন্তও বিদ্যমান। এদিনে প্রতিটি মুসলিম দেশ ও সমাজেই উৎসবের একটি আমেজ বিরাজ করে। বাচ্চারা নতুন পোশাক ও ভালো খাবারের বিষয়টি উপভোগ করে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বিত্তহীনতা, দারিদ্র্য, সংকট ও অভাব অন্য বহু সময় ও পরিস্থিতির মতো এদিনেও একটি বেদনাঘন চিত্রের জন্ম দেয়। গরিব মানুষেরা ঈদের আনন্দে নিজেরাও শরিক হতে পারে না, শরিক করতে পারে না নিজেদের শিশু সন্তানদের। এ কারণে আনন্দের এ দিনটিতেও বিরাট সংখ্যক মানুষের জীবন কেটে যায় কিছুটা নিরানন্দে। অথচ সচ্ছল, বিত্তবান প্রতিবেশী মুসলমানরা তাদের দিকে খেয়াল রাখলে পরিস্থিতি এমন হতো না। সদকাতুল ফিতর, জাকাতসহ সাধারণ দান, হাদিয়া ও উপহারের চর্চা দরিদ্র মুসলমানদের প্রতি ব্যাপক হলে ঈদের দিনের আনন্দের চিত্রটি অনেক বেশি সুন্দর হতো, সুখের হতো, সওয়াবেরও হতো।

ঈদ আল্লাহর দেওয়া তোহফা, তাই এর উদযাপনও হবে তার সন্তুষ্টি মোতাবেক, শরিয়তের হুকুম অনুসারে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ


এ কথা সত্য যে, এদেশে বিত্তবান ব্যবসায়ী, রাজনীতিকসহ সচ্ছল মানুষের বিরাট একটি সংখ্যা গরিব মানুষদের হাতে ঈদ উপলক্ষে কিছু উপহার কিংবা অর্থকড়ি তুলে দিয়ে থাকেন। বাহ্যিকভাবে এর কিছু সুফলও লক্ষ করা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থকড়ির নগদ প্রবাহে ভাটা এবং রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের সমস্যাপূর্ণ পরিস্থিতি গরিবদের প্রতি এ ধরনের দান-খয়রাতের ব্যাপকতা কমিয়ে দিয়েছে। এতে গরিব মানুষেরা অনেক বিপন্ন ও নিঃসঙ্গবোধ করছেন।

ঈদুল ফিতরে এদিকটির প্রতি সামর্থ্য ও সচ্ছলতা অনুযায়ী প্রত্যেকেরই খেয়াল রাখা উচিত। এ ক্ষেত্রে কেবল অধিক বিত্তবানদের কিছু করার জন্য অপেক্ষা না করে বিত্তবান, মধ্যবিত্ত ও স্বল্পবিত্ত সবারই কিছু না কিছু পদক্ষেপ থাকলে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের একটি উজ্জ্বল চেহারা আমরা দেখতে পাব। সংযম ও তাকওয়ার দীক্ষা গ্রহণের মাসের শেষে আনন্দের দিনটিতে একটি মুসলিম সমাজ ও দেশে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল একটি চেহারা প্রকাশিত হওয়ার সম্ভাবনাটিকেই আমরা বড় করে দেখতে চাই। 

ইসলামের বিধানমতে, ঈদ আনন্দ-উৎসবের দিন। এ আনন্দ আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্তির। মাগফিরাত প্রত্যাশার। আল্লাহর প্রতি সমর্পিত হওয়ার। আল্লাহ তোমার হুকুম আদায় করার তওফিক দিয়েছ, তোমার শোকর হে আল্লাহ! তুমি মাগফিরাতের ঘোষণা দিয়েছ, সে প্রত্যাশা রাখি হে আল্লাহ! ঈদের আনন্দ প্রকাশ পাবে আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করে, তাকবিরের মাধ্যমে। আল্লাহতায়ালা (এদিকে ইঙ্গিত করে) বলেন, ‘এবং (তিনি চান) যাতে তোমরা (রোজার) সংখ্যা পূরণ করে নাও এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন সেজন্য আল্লাহর তাকবির পাঠ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’ -সূরা বাকারা : ১৮৫

প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ-পর্ব রয়েছে। আমাদের নবীজিও দিয়েছেন আমাদের আনন্দের দিন। এই ঈদের দিনই সেই দিন। নবী কারিম (সা.) বলেন, প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব উৎসবের দিন রয়েছে; আর এই দিন হলো আমাদের উৎসবের দিন। Ñসহিহ বোখারি : ৯৫২

অতএব আমাদের ঈদ অন্যদের উৎসবের মতো নয়। এই ঈদ আল্লাহর দেওয়া তোহফা, তাই এর উদযাপনও হবে তার সন্তুষ্টি মোতাবেক, শরিয়তের হুকুম অনুসারে। বিষয়টি আলোচনা ও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। কারণ, ঈদ মুসলিম মিল্লাতের শিআর (ইসলামের দৃশ্যমান রীতিনীতি) এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয় চিহ্ন। আমাদের ঈদ আমাদেরই। শরিয়তের অন্যান্য বিধানের মতো আমাদের ঈদেরও রয়েছে অর্থ-মর্ম এবং স্বাতন্ত্র্য। অন্য কোনো উৎসব-উদযাপনের সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। ঈদ নিছক কোনো বিনোদন বা পর্ব-উৎসব নয়; বরং ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

ঈদের প্রেক্ষাপট যদি লক্ষ করি, তাহলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। হজরত আনাস (রা.) বলেন, হজরত রসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় আগমন করলেন দেখলেন, মদিনার অধিবাসীরা বছরে দুইবার খেলাধুলা ইত্যাদির মাধ্যমে আনন্দ-উৎসব করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ দুই দিন কীসের দিন? লোকেরা উত্তরে বলল, আমরা জাহেলি যুগ থেকে এ দুই দিন আনন্দ-উৎসব করে আসছি। তখন নবী কারিম (সা.) বললেন, এ দুটি দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। সে দুটি দিন হলো, ইয়াওমুল আজহা ও ইয়াওমুল ফিতর (অর্থাৎ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা)। -সুনানে আবু দাউদ : ১১৩৪

অর্থাৎ আমাদের ঈদ আল্লাহ প্রদত্ত। আর তা হচ্ছে দুই ঈদের দিন। ইসলামে তৃতীয় কোনো ঈদ-উৎসব নেই। অতএব আমাদের ঈদ আনন্দ হবেÑ নির্মল, পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত। 

তবে ঈদের মূলপাঠ হচ্ছে, আল্লাহতায়ালার নেয়ামত লাভের অনুভূতি এবং ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা অন্তরে জাগরূক রেখে ঈদগাহে হাজির হওয়া। একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হওয়া। এরপর অন্যান্য বৈধ সামাজিকতার পর্ব।

আমাদের পূর্ববর্তী আলেমদের অবস্থা তো এমন ছিল যে, তারা ঈদের দিন তটস্থ থাকতেন। তাদের বক্তব্য ছিল, আমি গোলাম। আমার মনিব আমাকে কাজ করার (আমলের) হুকুম করেছেন। আমি করেছি বটে। কিন্তু তিনি কতটুকু পছন্দ করেছেন তা আমার জানা নেই। রমজানজুড়ে রহমত ও মাগফিরাতের বহু উপলক্ষ বিরাজ করছিল। আমি এ নেয়ামতের কতটুকু সদ্ব্যবহার করতে পারলাম, ঈদের দিন আনন্দের পাশাপাশি এ অনুভূতিও তাদের ভাবিয়ে তুলত। অতএব এমন যেন না হয় যে, আনন্দের নামে বিনোদন করতে গিয়ে আমি ঈদের মূল আবেদনই ভুলে থাকলাম। 

ঈদকে উপলক্ষ করে শরিয়তবিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, বিভিন্ন জায়গায় আনন্দমেলা, কনসার্ট ও নানা অনুষ্ঠান ইত্যাদির আয়োজন হয়। এগুলো তো সর্বাবস্থাতেই পরিত্যাজ্য। তথাপি আল্লাহপ্রদত্ত ঈদ তার নাফরমানিতে ব্যয় করা আরও ভয়াবহ। এমন আচরণ ইসলামের শিআর তথা ইসলামের দৃশ্যমান রীতিনীতির সঙ্গে জঘন্য বেয়াদবি, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। 

ঈদ কেন্দ্র করে সমাজে যে প্রবণতার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে তার একটি হচ্ছেÑ ঈদ শপিং। রমজানুল মোবারকের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া হাসিল করা এবং ঈমান-আমলের উন্নতি করা। এগুলো বিসর্জন দিয়ে ঈদ শপিং এবং মেকআপ-ম্যাচিংয়ে বিভোর থেকে আখেরে আমি কীসের ঈদ করতে চাচ্ছি! তা কি একবার ভেবে দেখেছি! ঈদ কার জন্য? ঈদ তো তার জন্য, যে রমজানকে গনিমত মনে করে এর কদরে অগ্রগামী হয়েছে। ঈদ তো তার জন্য, যে ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে আমলের মাঝে রমজান অতিবাহিত করেছে। ঈদ তো তার জন্যে যে আল্লাহর হুকুম পালন করেছে। এখন তার রহমত ও মাগফিরাত প্রত্যাশা করছে।

পরিশেষে মহান আল্লাহর দরবারে মিনতি, রমজান ও ঈদ আমাদের জীবনে বয়ে আনুক আনন্দের বার্তা। ভ্রাতৃত্বের সওগাত। সকল অশান্তির অবসান ঘটুক। প্রতিষ্ঠিত হোক সাম্য, সততা, উদারতা ও পরার্থপরতার পরিবেশ। ঈমানি আবেশে গড়ে উঠুক মুসলিম সমাজ। আলোকিত হোক আমাদের ব্যক্তি, ঘর, পরিবার ও রাষ্ট্র। বিশ্বে আসুক শান্তি। থেমে যাক যুদ্ধ। মহান আল্লাহ সকল মজলুম ভাইদের সহায় হোন। বিশ্ববাসীকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দিন। সবাইকে ঈদ মোবারক। ঈদের শুভেচ্ছা। তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম অর্থাৎ আল্লাহতায়ালা আমাদের ও আপনাদের নেক আমলসমূহ কবুল করুন। আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।


মুফতি এনায়েতুল্লাহ

শিক্ষক ও কলাম লেখক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা