মধ্যপ্রাচ্য
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৫:১২ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র যখনই নিজের স্বার্থে টান অনুভব করে, তখনই তারা তাদের তথাকথিত ‘মিত্রদের’ অকূল পাথারে ফেলে চলে যায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য ছিল বিশ্ব পরাশক্তিদের দাবার বোর্ড। ওয়াশিংটন থেকে চালিত এই দাবার বোর্ডে আরব দেশগুলো ছিল কেবল ‘ঘুঁটি’, যাদের কাজ ছিল তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মার্কিন স্বার্থে আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধে অংশ নেওয়া। তবে সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল সামরিক উত্তেজনা এবং তার পরবর্তী শান্ত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছে যে, দীর্ঘদিনের সেই জরাজীর্ণ ও একপাক্ষিক সমীকরণ আর কার্যকর নেই। আমেরিকা ও ইসরায়েল যে ছক কষেছিলÑ অর্থাৎ ইরানকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এবং তাতে আরব দেশগুলোকে সামনের সারিতে লেলিয়ে দেওয়া তা কেবল ব্যর্থই হয়নি, বরং বুমেরাং হয়ে তাদের দিকেই ফিরে আসছে। আরব দেশগুলোর এই ‘কৌশলগত নীরবতা’ বিশ্বকে এক নতুন বার্তা দিচ্ছে : আরবরা আর অন্যের হয়ে বলির পাঁঠা হতে রাজি নয়।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের প্রাথমিক হিসাব ছিল অত্যন্ত সরল। তারা ভেবেছিল, ইরানের পাল্টা হামলার পর আরব দেশগুলো তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে মার্কিন ছত্রছায়ায় চলে আসবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর ‘আরব ন্যাটো’ বা আঞ্চলিক সামরিক জোটে যোগ দেবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের মতো দেশগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তারা জানিয়ে দিয়েছেÑ তাদের ভূখণ্ড, সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযানের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। এর প্রধান কারণ হলো ভৌগোলিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব। মার্কিন সৈন্যরা প্রয়োজনে তাদের ঘাঁটি ছেড়ে হাজার মাইল দূরে আটলান্টিকের ওপারে নিজ দেশে চলে যেতে পারে, কিন্তু সৌদি আরব বা কাতার তাদের মানচিত্র বদলাতে পারবে না। তাদের চিরকাল এই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলেই থাকতে হবে এবং ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশী হিসেবেই বসবাস করতে হবে। বিগত কয়েক দশকের ‘প্রক্সি ওয়ার’ আরব দেশগুলোকে একটি কঠিন পাঠ শিখিয়েছে- অশান্তি ও সংঘাত কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে, উন্নয়ন নয়। তাই তারা এখন আর বিদেশের মাটিতে বসে করা যুদ্ধের পরিকল্পনার অংশ হতে চায় না।
আরব দেশগুলোর এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে ওয়াশিংটনের ওপর চরম আস্থার সংকট। ওবামা প্রশাসন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্তÑ প্রতিটি ধাপে আরব দেশগুলো দেখেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যখনই নিজের স্বার্থে টান অনুভব করে, তখনই তারা তাদের তথাকথিত ‘মিত্রদের’ অকূল পাথারে ফেলে চলে যায়।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিনদের বিশৃঙ্খল পলায়ন, সিরিয়া ইস্যুতে তাদের দোদুল্যমান নীতি এবং কুর্দিদের সঙ্গে বার বার বিশ্বাসঘাতকতাÑ এই প্রতিটি ঘটনা আরব রাজতন্ত্রগুলোকে একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি করেছে : ‘আমেরিকা কখনোই আপনার চিরস্থায়ী বন্ধু নয়।’ ইরানের ড্রোন ও মিসাইল হামলার পর মার্কিন সামরিক শক্তি যেভাবে কেবল রক্ষণাত্মক অবস্থানে ছিল এবং ইসরায়েলকে পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছিল, তা আরব নেতাদের মনে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেÑ যদি আজ রিয়াদ বা দোহার ওপর বড় কোনো হামলা হয়, তবে কি আমেরিকা সত্যিই তাদের রক্ষায় জীবন দেবে? নাকি তারা কেবল দামি অস্ত্র বিক্রি করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করবে?
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন একাধিপত্য বা ‘আমেরিকান হেজিমনি’ এখন আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এখানে চীন ও রাশিয়ার প্রবেশ সমীকরণটিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে যে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, তা ছিল ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির কফিনে শেষ পেরেক। চীন এখানে নিজেকে কোনো পক্ষভুক্ত সামরিক শক্তি হিসেবে নয়, বরং একজন ‘শান্তি স্থাপনকারী’ এবং ‘বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদার’ হিসেবে জাহির করেছে। আরব দেশগুলো দেখছে, চীন তাদের সার্বভৌমত্বে বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করেই তাদের উন্নয়নের শরিক হতে চায়। সিরিয়া সংকটে রাশিয়ার সরাসরি ও সফল হস্তক্ষেপ আরব বিশ্বকে একটি বার্তা দিয়েছেÑ মস্কো তার মিত্রদের বিপদে ফেলে পালায় না।
আরব দেশগুলো এখন ‘ইকোনমি ফার্স্ট’ বা অর্থনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিতে চলছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন-২০৩০’ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক হাব হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার জন্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অপরিহার্য। যুদ্ধের একটি স্ফুলিঙ্গ যদি কোনো তেল রিফাইনারি বা পর্যটন কেন্দ্রে লাগে, তবে কয়েক দশকে গড়া তাদের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
গাজা ইস্যুতে ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের চরমপন্থী অবস্থান এবং নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা আরব বিশ্বের জনমতকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমানে কোনো আরব শাসকের পক্ষেই সম্ভব নয় ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অন্য কোনো মুসলিম দেশের ওপর হামলা করা। সৌদি আরব, ওমান ও কুয়েতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে যে সরাসরি মার্কিন-ইসরায়েল সমালোচনা শোনা গেছে, তা মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ জনমতেরই প্রতিফলন। তারা বুঝেছে, ইসরায়েল কেবল নিজের নিরাপত্তার প্রয়োজনে আরবদের ব্যবহার করতে চায় কিন্তু ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধান বা আঞ্চলিক শান্তিতে তাদের কোনো প্রকৃত আগ্রহ নেই।
আরব দেশগুলো এখন আর কেবল ‘তেল উত্তোলক’ দেশ হয়ে থাকতে চায় না। তারা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হতে চায়। ব্রিকস (BRICS)-এ সৌদি আরব ও আমিরাতের অন্তর্ভুক্তি এবং ডলারের বদলে অন্যান্য মুদ্রায় তেল বিক্রির আলোচনাÑ এই সবকিছুই মার্কিন একাধিপত্যকে স্থায়ীভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রক্রিয়ার অংশ। তারা বুঝতে পেরেছে, কেবল আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল থাকা মানেই হচ্ছে নিজের ভাগ্য অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। যদি পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে তা হবে মার্কিন অর্থনীতির জন্য গত এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।
এশীয় শক্তির উদয় ও নতুন দিগন্ত
আরব দেশগুলো এখন আর কারও আজ্ঞাবহ নয়, বরং তারা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ অর্জন করার পথে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আমেরিকা যেভাবে তার ঘাঁটি ছেড়ে বা কৌশল বদলে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে পারে, আরব দেশগুলোর পক্ষে তা সম্ভব নয়। ইরান তাদের চিরস্থায়ী প্রতিবেশী, আর যুক্তরাষ্ট্র একজন সাময়িক অভিভাবক মাত্র। এই চরম সত্যটি উপলব্ধি করেই আরব বিশ্ব আজ যুদ্ধের উস্কানি এড়িয়ে শান্তির পথে হাঁটছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। শক্তির দম্ভে পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার দিন শেষ হয়ে আসছে। এখনকার ভূ-রাজনীতি আর পেশিশক্তির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব এবং বহুমুখী মৈত্রীর ওপর দাঁড়িয়ে। আরব দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় যে প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে, তা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যকে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণমুক্ত এক নতুন ও স্থিতিশীল রূপ দান করবে। আমেরিকার একাধিপত্যের দিন হয়তো চিরতরে শেষ হওয়ার পথে, যেখানে এশীয় শক্তিগুলোই হবে আগামী দিনের প্রধান নিয়ামক।
শাহাব উদ্দিন মাহমুদ
কলামিস্ট ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক