খাল খনন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:১২ পিএম
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৪:১২ পিএম
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক পরিবেশ আজ বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে খরা, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যাÑ এই দুই চরম পরিস্থিতি গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। যে কারণে খাল খনন ও পুনঃখননকে ঘিরে একটি জাতীয় কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা সময়ের দাবি ছিল। এমন বাস্তবতায় দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় ‘খাল খনন’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১৬ মার্চ, সোমবার কোদাল দিয়ে মাটি কেটে তিনি দেশব্যাপী এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন। এই উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশব্যাপী ‘নদী-নালা-খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন’ কর্মসূচি শুরু হলো। উদ্বোধন শেষে খালের পাড়ে একটি বৃক্ষও রোপণ করেন তিনি। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি জেলায় এ কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জলাধার সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়।
উল্লেখ
করা প্রয়োজন, কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের স্বপ্ন বাস্তবায়নকল্পে
কোদাল হাতে তুলে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বরে তার
হাত ধরেই শুরু হয়েছিল খাল খনন কর্মসূচি। লক্ষ্য ছিল বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখা
এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের
মডেল তৈরি করা। তিনি যশোরের উলাশীর খাল থেকে শুরু করেছিলেন এই কর্মসূচি, যা ছিল সে
সময়কার একটি পাইলট প্রকল্প। স্থানীয়দের কাছে ‘জিয়া খাল’। সে সময় সরকারি পরিকল্পনা ও
স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রশাসন স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত
করে দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শুরু করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের
মাধ্যমে দলবদ্ধভাবে খাল খননের কাজে অংশগ্রহণ করতেন।
৫০ বছর পর বাবার দেখানো সেই কর্মসূচির
ধারাবাহিকতায় খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছেন তারেক রহমান। খাল খননের প্রয়োজনীয়তার কথা
তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের অনেক খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার সময় পানি ধরে রাখা
যায় না। একদিকে বন্যার সময় হঠাৎ করে উজান থেকে আসা পানি মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্যদিকে
শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। তিনি মনে করেন, খাল খননের মাধ্যমে বর্ষার
অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং তা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী
খালের দুই পাশে বৃক্ষরোপণের কথাও উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য,
কাহারোল উপজেলার ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি খনন
শেষ হলে এলাকার প্রায় ৩১ হাজার কৃষক সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে প্রায় ১ হাজার
২০০ হেক্টর জমি এই সেচব্যবস্থার আওতায় আসবে এবং সাড়ে তিন লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে এই
খালের পানির সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন।
একসময় বাংলার গ্রামাঞ্চলে
বিস্তৃত খাল-নদী ছিল প্রাকৃতিক পানি-নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থার মূল ভিত্তি। কিন্তু দীর্ঘদিনের
অবহেলা, দখল ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে অধিকাংশ খাল আজ ভরাট বা মৃতপ্রায়। ফলে বর্ষা
মৌসুমে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না, সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা ও বন্যা। আবার
শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়, দেখা দেয় খরা পরিস্থিতি। তাই খাল খনন
কর্মসূচিÑ এই দুই সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। খালগুলো পুনরুজ্জীবিত হলে বর্ষার
পানি সহজেই প্রবাহিত হয়ে নদীতে গিয়ে পড়বে, জলাবদ্ধতা কমবে। একই সঙ্গে এই খালগুলো শুষ্ক
মৌসুমে পানি সংরক্ষণ করে সেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এতে কৃষকরা সারা বছর চাষাবাদ
করতে পারবেন এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এ কথা সত্য, কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য
পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টেকসই সেচব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে কৃষির কাঙ্ক্ষিত
উন্নয়ন সম্ভব নয়। খাল খনন একটি কম ব্যয়বহুল, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান,
যা স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করে বাস্তবায়ন করা যায়।
আমরা মনে করি, খাল খনন এবং পুনঃখননের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য
রক্ষা পাবে, মৎস্য সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ
সৃষ্টি হবে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে কাজ
করতে পারে। তবে সরকারের এই খাল খনন কার্যক্রম সফল করতে হলে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা
ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, খননের নামে অপচয় ও দুর্নীতি ঘটে,
যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে। তাই স্থানীয় সরকার, প্রশাসন ও জনগণের সমন্বয়ে
একটি কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
আমরা মনে করি, সরকারের খাল খনন কর্মসূচি দেশের কৃষি,
পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ রক্ষায় একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা উপকৃত
হবেন, বাড়বে খাদ্য উৎপাদন এবং শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি। তাই জনগণের সম্পৃক্ততা
নিশ্চিত করে এই উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হোক। আমরা বলতে চাই, কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জনে
খাল খনন এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।