রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ১৪:১২ পিএম
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ হচ্ছে আধুনিক সভ্যতায় উন্নয়নের স্মারক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, আমাদের দেশে বিদ্যুৎখাত দুর্নীতির স্মারকে পরিণত হয়েছে। যত বড় প্রকল্প তত বেশি দুর্নীতি। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে এই খাতের এক শ্রেণির দুর্নীতিকে দায়মুক্তিও দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বড় প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্ট। যেখানে ব্যয় ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অথচ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল অনেক আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে। উল্লেখ্য, রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম। বাংলাদেশ সরকার এবং রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পের বড় অংশই ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক দশক ধরে এই ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছেÑ এই প্রকল্পের আর্থিক দায়ভার শেষ পর্যন্ত কতটা টেকসই হবে? তাই বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১৫
মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র : জাতির ঘাড়ে
শ্বেতহস্তী’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ ও
রাশিয়ার সরকারের মধ্যে ২০১১ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের
চুক্তি হয়। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে প্রতিটি এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার
দুটি ইউনিটের মাধ্যমে মোট দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ২০১৫ সালে
রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন হয়। প্রকল্পের খরচের ৯০
শতাংশ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া। প্রকল্পটির উৎপাদন সূচি এ বছর শুরু হওয়ার কথা। এখন
পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় ধরে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এই অর্থ প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমাও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সাল করা হয়। ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বাড়ানোর এই প্রস্তাব অনুমোদনের পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পটি আমাদের দেশের জন্য ‘শ্বেতহস্তী’ হয়ে দাঁড়াবে কি না।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১৬ দিন আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.
মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল-একনেক বৈঠকে
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় আরও ২৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা
বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প পরিকল্পনার সময় বিনিময়
হারজনিত ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়াই এখন বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, রূপপুর পারমাণবিক
বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচের ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ শুরু থেকেই
আলোচিত। ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট, গ্লোবাল ডিফেন্স
কর্প নামের আমেরিকার একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়,
রূপপুর প্রকল্প থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ
জয়, ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিকসহ পাঁচজন মিলে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। শুধু
তাই নয়, প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি এবং চুক্তির নানা শর্ত নিয়ে বিদেশি মহলেও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া আবাসন ব্যয় থেকে শুরু করে নির্মাণ সামগ্রীর দামÑ সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয়ের
অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বালিশ বা আসবাবপত্রের অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে যে আলোচনা
তৈরি হয়েছিল তা দেশের মানুষের কাছে প্রকল্পের দুর্নীতির প্রতীক হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক
পর্যবেক্ষকদের অভিমত, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে
অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বৈদেশিক ঋণের চাপ সামাল দিতে নানা চ্যালেঞ্জের
মুখে রয়েছে।
এ কথা মানতেই হবে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা
ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। জ্বালানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা
ব্যবস্থাÑ সবকিছুতেই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় তৈরি হয়। ফলে প্রকল্পটি শুধু নির্মাণ ব্যয়ের
মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বহু বছরের পরিচালন ব্যয়। তবে এটাও সত্য যে
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি সম্ভাবনাময়
পথ হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে
সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় জনগণের
টাকায় গড়া এই প্রকল্পই হয়ে উঠতে পারে দুর্নীতির প্রতীক।
তাই এখন সময় এসেছে রূপপুর প্রকল্পের প্রতিটি ধাপের ব্যয়
ও সিদ্ধান্তের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার। এই ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটি, দুর্নীতি
দমন সংস্থা এবং স্বাধীন অডিটের মাধ্যমে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক দিকগুলো পর্যালোচনা
করা প্রয়োজন। উন্নয়নের নামে যদি অপচয় ও দুর্নীতি চলতেই থাকে তবে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত
জাতির ঘাড়ে বোঝা হয়েই থাকবে।
মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ খাত দেশের উন্নয়নের
জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই খাতে যদি দুর্নীতি ও অপচয় চলতেই থাকে, তাহলে তার বোঝা
শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হয়। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার
মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করা এখন সময়ের দাবি। এতে দেশের
অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি জনগণও উন্নয়নের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।
আমরা বিশ্বাস করি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের জ্বালানির ভবিষ্যতের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু সেটি যেন দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে না গিয়ে দেশের
অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনে সেটা নিশ্চিতের দায়িত্ব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরই।